আনোয়ারায় হাতির আক্রমণে বৃদ্ধ নিহত, বান্দরবানে পাহাড় কাটা এবং হালদায় মাছ মরা একই সূত্রে গাঁথা !

unnamed-2.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।
———————–

আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মৃত আলতাফ আলীর পুত্র আব্দুর রহমান (৭০) গত ১৩ জুলাই’১৮ ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় বন্যহাতির আক্রমণের শিকার হন। পরে স্থানীয়রা তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। কয়েক সপ্তাহ আগে বাঁশখালীর পাহাড় থেকে আনোয়ারার দেয়াং পাহাড়ে অবস্থান নেয় কয়েকটি হাতি। জানা যায়, প্রতিদিন সন্ধ্যায় খাবারের খোঁজে উপজেলার বটতলী, বৈরাগ, বাশারতসহ বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি করছে। হাতির আক্রমণের ভয়ে প্রতিরাতে স্থানীয়রা পাহারা দিচ্ছেন। বন বিভাগের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন আমাদের লোক ওখানে যাচ্ছে। হাতিগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে কষ্ট হচ্ছে এবং কিছু সময় লাগছে। বন বিভাগ নিহত পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেবে’।{সূত্রঃ সুপ্রভাত, ১৪ জুলাই’১৮} অন্য এক সূত্র থেকে জানা যায়, ‘২০১২ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবছর ঢুকে পড়ছে বন্যহাতি। গত ৬ বছরে আনোয়ারায় অন্তত ৩ জন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছে। এর তিন দিন আগেও চাঁপাতলি গ্রামের এক মহিলা হাতির আক্রমণে আহত হন। তাছাড়া বন্যহাতি অনেকের কাঁচা ঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে’। {সূত্র, আজাদী, ১৪ জুলাই’১৮} বন্যহাতি গুলো বনে পর্যাপ্ত খাদ্য না পেয়ে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে প্রতিবছর হামলা চালাচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়ী, ফসল ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্থ করছে, মানুষকে আঘাত করছে, আঘাতে মানুষের অপমৃত্যু হচ্ছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী গত ১৪ জুলাই’১৮ তারিখে হাতি দুটি বাঁশখালী হয়ে তাঁদের মূল গন্তব্য স্থল চুনতি অভয়ারণ্যের দিকে চলে গেছে।

‘বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও থামছে না পাহাড় কাটা। রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বান্দরবানের লেমুঝিরি পাড়ায় মৎস্য খামারের রাস্তা নির্মাণের স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটছে বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জামাল চৌধুরী। তার দেখাদেখি আশেপাশের আরো কয়েকটি স্থানে স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার মহোৎসবে মেতেছে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি’ { সূত্রঃ সুপ্রভাত, ১১ জুলাই’১৮}। জানা যায়, বান্দরবনের সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লেমুঝিরি এলাকা, লেমুঝিরি বম ছাত্র হোস্টেলের পার্শ্ববর্তী এবং লেমুঝিরি থেকে মায়াবন পাড়ার মধ্যবর্তী আরো তিনটি স্থানে পাহাড় কাটা চলছে। এখানে উল্লেখ্য, লেমুঝিরি পাড়ায় পাহাড় ধসে গতবছর শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়। তারপরও পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না এখানে। স্কেভেটর দিয়ে যেভাবে খাড়া পাহাড় কাটা হয়েছে বৃষ্টিতে যে কোন মুহূর্তে পাহাড়টি ধসে ফের বিপদের আশংকা করছেন স্থানীয়রা। লেমুঝিরি এলাকার বিশাল একটি পাহাড়ের এক পাশ ইতিমধ্যে কেটে সাবাড় করে দিয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যানের নিয়োজিত শ্রমিকেরা।

“পাহাড় কাটার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জামাল চৌধুরী বলেন, ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জনস্বার্থেই পাহাড় কাটা হচ্ছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের থোক বরাদ্দ এবং ব্যক্তিগত অর্থায়নে পাহাড় কেটে এখানে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। তাছাড়া আমার খামার বাড়ী থেকে মায়াবন পর্যন্ত চলাচলের কোন রাস্তা নেই। উন্নয়ন কাজের স্বার্থে পাহাড় কাটার নিয়ম আছে। তাই স্থানীয়দের স্বার্থে স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করছি। পাহাড়ের ভারসাম্য রক্ষা করে এখানে একটি ডেইরি ফার্ম করার স্বপ্নও রয়েছে আমার” {সূত্র; সুপ্রভাত, ১১ জুলাই”১৮}। এই না হলেও কি জননেতা ? কি সুন্দর যুক্তি তার নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, নিজের ব্যবসার জন্য স্থানীয়দের নামে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে তাঁর ভাষায় পাহাড়ের ভারসাম্য রক্ষা করে ডেইরি ফার্ম করবেন তাও আবার সরকারি অর্থে। জেলা প্রশাসক যদিও মুখে বলছেন প্রশাসন পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন, কোন যুক্তিতেই পাহাড় কাটা যাবেনা, তাঁদের অভিযান চলছে, জরিমানা করা হচ্ছে তাহলে একটি বিরাট পাহাড়ের অর্ধেক কিভাবে সাবাড় হয়ে গেল তা আমাদের বোধগম্য নয়। বোধগম্য নয় পরিবেশ অধিদপ্তর কিভাবে একটা পাহাড়ের অর্ধেক কাটার পরেও নিশ্চুপ রয়েছে। এ বছর পাহাড় ধসে ঘুমধুমে ৩ জন, লামায় ৩ জন এবং জেলা শহরে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। গত দুদিন ধরে এই নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে ভেসে উঠছে’।{সূত্রঃ আজাদী, ২১ জুন’১৮}। ‘বন্যার পানিতে ১০ দিন ধরে হাটহাজারীসহ হালদা নদীর আশেপাশের এলাকা ডুবেছিল। পানিবন্দি হয়ে থাকার ফলে বিষাক্ত বর্জ্য মিশে পানির অক্সিজেন কমে যাওয়ার কারণে হালদায় সম্প্রতি বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন মৎস্য বিজ্ঞানী ও হালদা বিশেষজ্ঞরা। বারংবার এমন পরিস্থিতি এড়াতে দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি বিশেষজ্ঞদের। চবির প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডঃ গাজী সৈয়দ মোহাম্মদ আসমত বলেন, বিভিন্ন কল-কারখানার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে হালদার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে আসছে। হালদাকে দূষণ থেকে রক্ষা করতে হলে আগে বিভিন্ন কল-কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি কারখানাগুলোতে বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে অ্যানার্জি পারফর্মেন্স সার্টিফিকেট (ইপিসি)র আওতায় আনার দাবি জানান তিনি’।{ সূত্রঃ সুপ্রভাত, ২৭ জুন;১৮}। “উপমাহদেশের একমাত্র প্রকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী রক্ষায় হাটহাজারী পিকিং আওয়ার প্লান্টসহ অক্সিজেন থেকে কুলগাঁও পর্যন্ত শিল্প কারখানা এবং এশিয়ান পেপার মিলসহ অন্যান্য শিল্প কারখানায় ইটিপি স্থাপন ও ব্যবহার করাসহ ১১টি সুপারিশ করেছে হালদা রক্ষা কমিটি। গতকাল (২৯ জুন’১৮) সকালে প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব সুপারিশ উপস্থাপন করেন হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও চবির প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া”।{ সূত্রঃ আজাদী, সুপ্রভাত, ২৯ জুন’১৮}। হালদা নদীর পানি দূষণ, মা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মারা যাওয়ার ব্যাপারে বিগত একমাস থেকে চট্টগ্রামের সকল দৈনিক পত্রিকা এবং জাতীয় পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। মানব বন্ধন সভা সমাবেশ হয়েছে নদী রক্ষার জন্য। বিভিন্ন কল কারখানার শিল্প এবং আবাসিক বর্জ্য সরাসরি হালদা নদীতে এসে পড়ছে। অবৈধভাবে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন, ইঞ্জিনচালিত নৌকার পোড়া মুবিল, কীট নাশক পানিতে ফেলা, মাছ মারার জন্য বিষপ্রয়োগ সহ পানিতে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণের কারণে হালদার পানি দিন দিন দূষিত হয়েছে। এবারের বন্যায় ট্যানারি সহ বিভিন্ন শিল্প বর্জ্য পানিতে মিশে পানির আকার কালচে আকার ধারণ করেছে, পানিকে মারাত্মকভাবে দূষণ করেছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা গেছে। জলজ জীব বৈচিত্র্য , প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র আজ বিরাট পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকীতে আছে।
চট্টগ্রাম নগরে ইতিমধ্যেই প্রায় সব পাহাড় সাবাড় হয়ে গেছে হাতে গোণা ৭/৮ টি হয়তবা অবশিষ্ট আছে আমাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য, ক্রমবর্ধমান এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের জন্য। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের সাময়িক এবং মানবিক আশ্রয় দিয়ে উখিয়া, টেকনাফ, বান্দরবান, কক্সবাজার সহ পার্বত্য অঞ্চলের অনেক সবুজ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাবাড় হয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় এবং জ্বালানি কাঠ যোগান দেয়ার জন্য। আমরা আজ বড় নিষ্ঠুর, নির্দয়, অবিবেচক হয়ে গেছি। নিজেদের স্বার্থে বন জংগল পাহাড় পর্বতের গাছ গাছালি কেটে ফেলছি, সবুজ পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলছি। পাহাড় কাটছি, উন্নয়ন করছি, অট্টালিকা বানাচ্ছি, নদী নালা, পুকুর ডোবা জলাশয় ভরাট করছি, সবুজ মাট খোলা প্রান্তর দখল করছি, নদীর পানি দূষণ করছি। জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, জলজ প্রাণী বিপুপ্ত হচ্ছে পরিবেশ প্রতিবেশকে ধ্বংস হচ্ছে। নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছি। তাই খাদ্য না পেয়ে হাতির দল প্রতি বছর পাহাড় থেকে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে, মানুষকে আহত নিহত করছে। হালদা নদী প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে ৮০০ কোটি টাকার অবদান রাখছে। গত ১৪ জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, “প্রাকৃতিক উৎসের মাছে বাংলাদেশ বিশ্বে ৫ম স্থান থেকে ৩য় স্থানে উঠে এসেছে”। যা আমাদের দেশের জন্য একটি সুখের খবর হলেও প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রকে আমরা অবহেলা আর হেলা ফেলায় ধ্বংস করে ফেলছি। হালদা নদী দিনে ৯০০ কোটি লিটার পানি মদুনাঘাট পানি শোধনাগারের মাধ্যমে নগরের ৬০ লাখ মানুষকে সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। যেখানে প্রকৃতির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকার কথা, সদয় হওয়ার কথা সেখানে আমরা উল্টো প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি প্রতিনিয়ত। তাই প্রকৃতিও আমাদের সাথে বিরূপ আচরণ করছে, প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমাদের দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর আর বন বিভাগের কাজ কি তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাঁরা যদি তাঁদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য সততা, ন্যায় নীতি আর গুরুত্ব সহকারে পালন করতো তাহলে দেশের পরিবেশ প্রতিবেশ প্রকৃতিতে আজ ভয়াবহ, ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেমে আসতো না। আনোয়ারায় হাতির আক্রমণে বৃদ্ধ নিহত, বান্দরবানে পাহাড় কাটা এবং হালদায় মাছ মরা একই সূত্রে গাঁথা! সবক্ষেত্রেই মূল কারণ আমাদের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। আমাদের সকলের উচিৎ পরিবেশ প্রতিবেশ প্রকৃতি ধ্বংসকারী সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের বিরত রাখা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অতীব জরুরী হয়ে উঠেছে। দেশপ্রেম এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকলে পরিবেশ রক্ষা করা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।

Top