কেউ কথা রাখেনিঃ কোটা, কাঁটা ও একটি পাটক্ষেত

37044885_1367518950059298_1631306403828203520_n.jpg

আবুল কাশেম ম্যাক
উন্নয়ন কর্মী ও সাবেক ছাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
…………………………
এক সময় পাট সোনালী আঁশ হিসেবে বাংলাদেশের ব্যপক সুনাম অর্জন করেছে।এমন কি সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নও করা হইত সোনালী আঁশের দেশ কাকে বলা হয়? গত অর্থবছরে ২ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার পাট ও পাটজাত পন্য হতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে যা বিগত অর্থবছর হতে ৬.৫৬ শতাংশ বেশি।কাজেই পাটের প্রতি কৃষকদের একটু বাড়তি মনোযোগ থাকবেই।অনেক সময় এ বাড়তি যত্ন আবার ক্ষতির কারণও হয়ে দাড়ায়।
যেমন গ্রামের লোকজন চলাচলের জন্য জমির আইল ব্যবহার করে থাকেন।অনেক সময় চলাচলের সুবিধার জন্য ক্ষেতের মাঝ বরাবর হাটতে থাকেন।আর এভাবে হাটতে হাটতে ক্ষেতের মধ্যদিয়ে তৈরি হয় মাথার সিঁথির ন্যায় সরু পথ।অনেকেই জমির আইল ব্যাবহার না করে ঐ পথেই অনুসরণ করেন।
একদা এক কৃষক ও তার স্ত্রী ঝগরা করে ঐ পাটক্ষেতের কাছ দিয়েই যাচ্ছিলেন।কৃষক স্ত্রী পাটক্ষেতের কাছে আসতেই মন্তব্য করে বসলেন আহাম্মক! কৃষক থমকে দাড়ালেন,কে আহাম্মক? স্ত্রী বললেন তুমি আর তার চেয়েও বড় আহাম্মক এই পাটক্ষেতওয়ালা।
একথা শুনে চাষী স্ত্রীর পথরোধ করলেন এবং বললেন আগে এই কথার জবাব চাই তারপর তুমি যেতে পারবা।কৃষক বউ তখন বলে যে স্বামী পরের কথায় বউ পেটায় সেতো বড় আহাম্মক যেমন তুমি!
কৃষক তখন প্রশ্ন তুললেন এই পাটক্ষেতওয়ালাতো কারো কথায় বউ পেটায়নি তবে উনি কেন আমার চেয়ে বড় আহাম্মক?
কৃষক স্ত্রী তখন পাটক্ষেতের দিকে ইঙ্গিত করে বলে,এই দেখেন একটি পাটক্ষেতে কতগুলো রাস্তা সৃষ্টি হয়েছে?
আসলে মানুষের চলাচল বন্ধ করার জন্য পাটক্ষেতওয়ালা পথের শেষ মাথায় কাঁটা পুঁতে রাখতো আর মানুষ পাশ দিয়ে বিকল্প পথ তৈরি করত।এভাবে পাটক্ষেতে কয়েকটি রাস্তা হওয়ায় কৃষক অধিক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।সে যদি বারবার কাঁটা না দিয়ে ভাবতেন তাহলে হয়ত একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতো কিন্তু এখন তিনগুন ক্ষতি হল! তাই সে আরো বড় আহাম্মক ।
আসলে কাঁটা সবসময়ই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।তাই কাঁটা দিয়ে সব সময় সমাধান পাওয়া নাও যেতে পারে।যেমন বাংলায় বাগধারা রয়েছ,পথের কাঁটা তেমনি আবার রয়েছে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা ।
তমনি বর্তমান সময়ে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন কে সরকার ভাবছে পথের কাঁটা হিসাবে।তাই হামলা-মামলার মতো আর এক কাঁটা দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে চাইছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি অরাজনৈতিক সাধারন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের নেয্য আন্দোলন।এতে দেশের নব্বাই ভাগ মানুষের সমর্থন আছে।এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও মহান সংসদে দাড়িয়ে কোটা বাতিলের পক্ষে কথা বলেছেন।কিন্তু দুঃখের বিষয় শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন বন্ধ করে প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় তখনেই গনেশ উল্টেগেল! মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বললেন ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিবর্তন করা সম্ভব নয় কারণ আদালতের আদেশ আছে!
যদি আদালতের আদেশই থাকে তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিভাবে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেন? তাহলে কি মন্ত্রী মহোদয় বলতে চাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে? সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে ” প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে”। তবে সরকার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। তারমানে এই নয় ৫ শতাংশ মানুষের জন্য ৫৬ শতাংশ সুবিধা প্রদান।অবশ্যই তা সংখ্যাগুরু জনগনের চাহিদার নিরিখে নির্ধারিত হওয়া উচিত ।
হয়ত সরকার ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে আসল বাস্তবতা উপেক্ষা করছেন কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও দাবী জানিয়েছেন কোটা সংস্কারের পক্ষে, তাদের সন্তানরা এ অনৈতিক সুবিধা পাক তা তারাও চায় না।তাছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের যেমন ভোট আছে তেমনি কোটা সংস্কার পক্ষেরও ভোট রয়েছে। এ বছর প্রায় এক কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে যারা আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তাই সরকারের উচিত হবে কোটা সংস্কারের যোক্তিক সমাধান করা।

তবে দুঃখের বিষয় এ আন্দোলন বন্ধ করতে গিয়ে সরকার যেভাবে বলপ্রয়োগ করেছে তা শুভ বুদ্ধির উদায়ক নয়।প্রতিটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, বাকস্বাধীতা ও প্রতিবাদের অধিকার সাংবিধানিক অধিকার, কাজেই কোন গনতান্ত্রিক সরকারেই পারেনা এতে বাঁধা সৃষ্টি করতে।বলা হয় যেদেশে যত সহজেই প্রতিবাদ করা যায় সেদেশের গনতন্ত্র ততো বেশি শক্তিশালী ।যদি প্রতিবাদের অধিকার হারিয়ে যায় তবে যে মহান আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা হতে রাষ্ট্র হবে বিচ্যূত,জন্ম নিবে অপশক্তি।সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ভিত্তিতে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনই ছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র । যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার না থাকে তবে রাষ্ট্র ক্রমে ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হবে।তাই সকলের উচিত হবে সঠিক সময়ে প্রতিবাদ করা।
তাই আর জল ঘোলা না করে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিয়ে আহতদের সুচিকিৎসার ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হোক। নতুবা কাঁটা ব্যবহারকারী পাটক্ষেতওয়ালার মত অবস্থার তৈরী হবে। তবে এ যোক্তিক আন্দোলনে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ফল বয়ে আনবেনা। তাই সকল পেশাজীবী, শ্রমজীবী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহন করতে হবে।আর ইহাও মনে রাখা উচিত এ আন্দোলন যেন কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যবহার করতে না পারে।
পরিশেষে মার্টিন নিমোলার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করবো আর তা হলো” জার্মানিতে নাৎসিরা প্রথমবার কমিউনিস্টদের ধরতে এলো আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না।
যখন তারা সোস্যাল ডেমোক্রেটদের বন্দি করতে এলো তখনও আমি নিরব ছিলাম, কারণ আমি সোস্যাল ডেমোক্র্যাট ছিলাম না।
যখন তরা ইহুদিদের ধরার জন্য এলো তখনো আমি কোন শব্দ উচ্চরণ করিনি, কারণ আমি ইহুদি ছিলাম না।
যখন তারা আমাকে ধরতে এলো তখন আমার পক্ষে কথা বলার জন্য কেউ রইল না।
আজকে হয়ত নুর, রাশেদ ও সোহেল কে গ্রেফতার করা হয়েছে কালকে যে আপনি গ্রেফতার হবেন না তার কি নিশ্চয়তা আছে?? তখন হয়ত আপনার পক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে না!

Top