ঘুরে এলাম সুলতান সুলেমানের দেশ–আশ্‌ফা খানম (হেলেন)

IMAG5321.jpg

—————————–
(এক)
২০১৭ সালের রমজান মাসে ইফতারের পূর্বে চ্যানেল আই-এ ১৫ মিনিটের ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানে ধারাবাহিক ভাবে প্রদর্শিত ইসলামের নিদর্শন সম্বলিত স্থানসমূহের মধ্যে তুরস্কের বিভিন্ন স্থান দেখেছিলাম । যা দেখে ও ইতিহাস জেনে তা স্বচক্ষে দেখার জন্য মনে তীব্র আকাংখা তৈরী হয় । পরম করুনাময়ের অশেষ রহমত ও ইচ্ছায় বহু প্রতীক্ষিত তুরস্ক ভ্রমণের সুযোগ হয়। প্রফেসর গিয়াসুদ্দিন তালুকদার-এর পরিচালনায় বাংলাদেশ হজ্ব-এ- বাইতুল্লাহ ট্যুরিজমের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২৫ জনের একটি দল গত ১৮ই জুন ২০১৮ তুরস্ক সফরে জন্য ভিসার আবেদন করি । আমরা মাত্র ৮ জন ভিসা পাওয়ায় অবশিষ্টরা যেতে পারেননি। শুধুমাত্র আমেরিকান ভেলিড ভিসাধারীদের তুরস্ক এম্বেসি ই-ভিসা প্রদান করে । এতে তুরস্ক ভ্রমণকে নিতান্তই সৌভাগ্য ও আমাদের প্রতি পরম করুনাময়ের অশেষ দয়া প্রর্দশন মনে করি। অধম বান্দাহর এ ইচ্ছাটুকু পূরণের দোয়া কবুল করায় পরম করুণাময়কে জানাই শোকর আলহাম্‌দুল্লিাহ । গত ১৮ই জুন থেকে ২৫ শে জুন তুরস্কের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের চমৎকার সুযোগ করে দেয়ায় ‘বাংলাদেশ হজ্ব-এ বাইতুল্লাহ ট্যুর এন্ড ট্র্যাভেলন্স’-এর নিকটও কৃতজ্ঞতা জানাই ।
গত ১৬ই জুন মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। এর ১ দিন পর ১৮ই জুন সকালে আমরা ৮ জন যথাক্রমে টিম লিডার আমার স্বামী এডভোকেট জিয়া হাবীব আহ্‌সান, এডভোকেট মোহাম্মদ রফিকুল আলম, বিশিষ্ট ব্যাংকার জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক রোজিনা খানম, ব্রাক ইউনিভার্সিটির আইনের ছাত্র মোঃ শাহরিয়ার আলম ও নাসিরাবাদ সরকারী মহিলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী সিদরাতুল মুনতাহা শশী, সি.ভি.এন.এস স্টুডেন্ট আমার কনিষ্ঠ সন্তান আবু মোঃ রিয়াদ আহ্‌সান চট্টগ্রামের শাহ্ আমানত বিমানবন্দরে হাজির হই। এয়ার এরাবিয়া বিমান যোগে যথারীতি সকাল ১০ টায় বিমান সারজাহ্‌র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। মাত্র ৪ ঘন্টা ৩০ মিনিটের মধ্যে আমরা সারজাহ্‌ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারর্পোর্টে পৌঁছি। সেখানে প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পন্ন করে ভিআইপি লাউঞ্চ-এ ৬ ঘন্টা অতিবাহিত করি। লাউঞ্জের অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা আমরা সবাই উপভোগ করি। তবে দুভার্গ্যজনকভাবে ঈদের দিন থেকে আমাদের কাফেলার ১ জন (আল আরাফা ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জাহাঙ্গীর ভাই) জ্বর ও সর্দি কাশিতে ভুগছিলেন বিধায় তার জন্য সকলেরই খারাপ লাগছিল। অবশেষে ৬ ঘন্টা পর আকাংখিত শহর তুরস্কের ইস্তাম্বুল এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। রাত প্রায় ১১ টায় আমরা ইস্তাম্বুলের সাবিহা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট-এ পৌঁছি। আমাদের গাইড ইনজি (ছোট খাটো হাসিখুশি আধুনিক তুর্কী তরুণী) আমাদের জন্য আমার স্বামী জিয়া হাবীব আহ্‌সানের নাম লেখা কাগজ ধরে আমাদের খুজঁতে থাকে। খুব সহজে তাকে আমরা পেয়ে যাই । বিমান থেকে রাতের আধাঁরে ঝলমলে ইস্তাম্বুলের শহরের মতন যেন আমাদের গাইড ইনজিও ঝলমলে ছিল। উল্লেখ্য সফরকালীন সময়ে সে ইংরেজি ভাষায় আমাদের সাথে Communicate করে এবং ফাঁকে ফাঁকে আমাদের থেকে কিছু প্রচলিত বাংলা শব্দও রপ্ত করে নেয়। ইনজি’র পরিচয় না দিলেই নয়। সে ট্যুরিজম এর উপর অনার্স কোর্স করেছে । তার স্বামী ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক । তিনি তুরস্কের কাপাডোকিয়ায় অবস্থান করেন। চাকুরির কারণে তাকে এদিক সেদিক যেতে হয়। তার মতো একজন অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী গাইড থাকার কারণে তুরস্কের দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য সহজ ও আরো ইন্টারেস্টিং হয়। শুধু বেড়ানো বা শপিং করা ভ্রমণের উদ্দেশ্য হলে তা বিলাসিতা বৈ কিছু নয়। আমরা কাফেলার সবাই প্রকৃতপক্ষে সে উদ্দেশ্যে ভ্রমণে বের হইনি। আমরা সবাই সমমনা ছিলাম। আল্লাহ্‌র সৃষ্টির নিদর্শন এবং ইতিহাসে বিভিন্ন জাতির উত্থান ও পতনের চিহ্ন গুলো সত্যিই চিন্তার খোরাক যোগায় এবং আমাদেরকে সর্তক করে তোলে। এই লেখনীর মাধ্যমে এই ভ্রমনের অভিজ্ঞতা ও এর নিদর্শনগুলো থেকে যে জ্ঞান আহরণ করেছি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিসরে সবাইকে জানিয়ে আমার চমৎকার সফর অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। ১৯ শে জুন থেকে ২১শে জুন (৩ দিন) আমরা ইস্তাম্বুলে অবস্থান করি। গাইড সকাল ৮.৩০ এর মধ্যে গাড়ী করে আমাদের নিতে আসেন। আজ প্রথম যাত্রা। প্রথমে সে হোটেল লাউঞ্জে আমাদেরকে আজকের সিডিউল জানিয়ে দেয় এবং যখন যে জায়গায় গিয়েছি তা সে সেখানে ব্রিফ করে। গাড়ীতে যেতে যেতেও সে আমাদেরকে সেই দর্শনীয় স্থানগুলোর সর্ম্পকে বিবরণ দিতে থাকে। আমরাও কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তা ধৈর্য্যের সাথে বুঝে উত্তর দেয়। প্রথমেই সে আমাদেরকে নিয়ে যায় অটোম্যান সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান আবদুল মজিদের দোলমাবাগচী প্যালেসে। ১৯ শতকে নির্মিত এই প্যালেস পৃথিবীর সবচেয়ে মনমুগ্ধকর প্যালেস বা প্রাসাদগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি ইস্তাম্বুলের বেসিকটাস জেলায় যা তুরস্কের কোস্ট বসফরাস প্রনালীর ইউরোপিয়ান অংশে অবস্থিত। এটি অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজত্বকালে শাসকদের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল। যার সময়কাল ছিল ১৮৫৬-১৮৮৭ এবং ১৯০৯-১৯২২। এটি ১১.১ একর জমির উপর নির্মিত। এতে ২৮৫ টি কক্ষ, ৪৬টি হলঘর, ৬টি হাম্মাম খানা (গোসলখানা), এবং ৬৮টি ওয়াসরুম আছে। অটোম্যান শেষ সুলতান ৬ষ্ঠ মুহাম্মদ এতে বসবাস করতেন। প্রাসাদটি বসফরাসের কোল ঘেষে ৬০০ মিটার দীর্ঘ। এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ১৩ বছর লেগে যায় এবং ১৮৫৬ সালে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। জানা যায় বসফরাসের কোল ঘেষে গাছ লাগিয়ে বাগান করে এর মাটি শক্ত করে এর নির্মাণ কাজ করা হয় বলে এই প্রাসাদের নামকরণ করা হয়েছে দোলমা বাগচী (বাগিচা)। অটোম্যান সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান আবদুল মেজিদ ইউরোপিয়ান ধাঁচে (তোপকাপি প্যালেস ছাড়াও) আরো একটি প্যালেস নির্মাণের আগ্রহ দেখান। দোলমাবাগচি প্যালেস সেই আদলে নির্মাণ করেন আর্মেনিয়ান আর্কিটেক্ট কারাবেত বালিয়ান এবং তার পুত্র নিকোগোস বালিয়ান। এটি অত্যন্ত বিলাস বহুল, দৃষ্টিনন্দন এবং জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন আর্কিটেকচারেল ডিজাইনের সংমিশ্রণে তৈরী করা হয়। দোলমাবাগচী প্যালেসের বিশেষত্ব হলো এর ডাইনিং হলের হাতে বানানো বিশেষ প্যাটার্নের ফ্লোর। যেখানে রোজউড, ইবোনী, মেহগনীর মাস্টার পিস ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এই ফ্লোর লুকিয়ে আছে মনোমুগ্ধকর দামীদামী ফার্নিচারে। এখানে রয়েছে একটি Ceremonial Hall যেখানে কুইন ভিক্টোরিয়া থেকে উপহার প্রাপ্ত ঝাড়বাতি আছে যার ওজন ৪.৫ টন এবং এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঝাড়বাতি। এই প্যালেসে ২০২ টি ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের প্রথম দিকের চিত্রকর্মও রয়েছে। যা দেখে আমরা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম । ২০১৪ সালে জাতীয় প্যালেস পেইন্টিং মিউজিয়ামটি প্যালেসের বর্ধিত স্থানে প্রদর্শনের জন্য খোলা হয়। এই প্রাসাদের নির্মাণ খরচ পড়ে ২০১৩ সালের মুদ্রা মূল্য অনুসারে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। প্রাসাদের অভ্যন্তরে মহিলারা মূল হল ঘরের রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলো হেরেমের চারপাশে কারুকার্য খচিত পর্দার মতো গ্রীলের ফাঁক দিয়ে উপভোগ করতেন। প্রাসাদটি কামাল আতাতুর্কের হস্তগত হলে তিনি হেরেমের একটি ছোট কক্ষে অবস্থান করতেন(যিনি আধুনিক তুরস্কের জনক)। এ প্রাসাদেই তাঁর মৃত্যু হয় । উনি যে সময় মৃত্যুবরণ করেন প্রাসাদের প্রতিটি ঘড়ির সে সময়কে বন্ধ করে স্থির করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তাকে স্মরণ করেন। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ১০ ই নভেম্বর ১৯৩৮ সালে সকাল ৯টা ৫মিনিটে মারা যান। কামাল আতার্তুক তুর্কী রিপাবলিকানের সকল সরকারী কার্যালয় রাজধানী আংকারায় নিয়ে গেলেও তিনি ইস্তাম্বুলে আসলে দোলমাবাগচীর হেরেমে একটি ছোট কক্ষে অবস্থান করতেন। তিনি তাঁর অবস্থানকালে সেখানে বিদেশী অতিথিদের স্বাগত জানাতেন। এছাড়াও বিভিন্ন জাতীয়, ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক সেমিনার বা মিটিং এই অদ্ভূত সুন্দর‍ প্রাসাদেই অনুষ্ঠিত হতো। দোলমাবাগচীতে অডিও হেডফোন দেয়া হয় যা নম্বর সেনসর করা । প্রতিটি রুমের ডাইসে নম্বর থাকে যা হাতে রাখা যন্ত্রটি দেখলে সেই রুম এবং রুমটি সম্পর্কে বলা শুরু করে। হেডফোন সংগ্রহ করার সময় যে যার ভাষা সেট করে নেয়। তাদের নিদর্শন গুলোকে এভাবে যতেœর সাথে সংরক্ষণ করতে দেখে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে আমরা সত্যিই বিমোহিত হই। অথচ ভারতে অবস্থিত সপ্তার্শ্চযের অন্যতম নিদর্শন তাজমহল অনাদরে, অযত্নে ধ্বংস প্রায় হতে চলেছে।দোলমবাগচী প্যালেস পরির্দশন শেষে ‘হাজিয়া সোফিয়া’ পরির্দশনে রওনা হই । যার মনোরম দৃশ্য আমাদের আরো হতবাক করে । এটি গ্রীক আর্থোডক্স খ্রীস্টানদের প্রার্থনার চার্চ ছিল। পরবর্তীতে অটোম্যানদের রাজত্বকালে একে মসজিদে পরিণত করা হয়। এটি যখন মসজিদে পরিনত হয় তখন এর ভিতরে আরো কিছু কাজ করা হয়। যেমন-চার্চে যীশুখ্রীষ্ট, মেরি এবং অন্যান্য হাওয়াড়াদের ও বিভিন্ন চিত্রগুলো বিলীন করে না দিয়ে তার উপর সাদা প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। কিন্তু একই স্থানে কয়েকটি মসজিদ থাকায় পরবর্তীতে হাজিয়া সোফিয়া কে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয় এটি ৫৫ মিটার উচুঁ। এটি Insidore of Miletus and Anthoried of Traller ডিজাইন করেন এবং ৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে এটি নির্মিত হয়। এটি প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা, এথেন্সের পার্সিনোন এর মতো কসমোপলিটন সিটির সুদীর্ঘ নিদর্শন স্বরূপ। এটি তুর্কীর পুরানো ইস্তাম্বুলে শত শত বছর ধরে খ্রীষ্টান এবং মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হলে পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং আজকের যে হাজিয়া সোফিয়া তা ৫৩৭ সালের। ১৯৩৫ সাল (কামাল আতাতুর্কের তুর্কী রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ৯ বছর পর) থেকে এটি মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বছরে প্রায় ৩০ লক্ষেরও বেশী দর্শনার্থী এটি পরিদর্শন করে। তৎকালীন আর্থোডিক্স এর চার্চগুলোর মতো এটির বিশাল গম্বুজ এবং সেমি গম্বুজ আছে। ভিতরে গম্বুজের বৃত্তে ৬ পাখাওয়ালা এঞ্জেল এর মোজাইক রয়েছে । সে সময়ের বাইজেন্টাইন্ট সাম্রাজ্যের ক্ষমতা বুঝাতে চার্চের মূল অংশে সে সময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সকল রাজ্য থেকে আর্কিটেকচারাল নমুনা সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এবং সেগুলো দিয়ে মূল গম্বুজ বানানো হয়। এর ফ্লোরের এবং ছাদের অংশ উত্তর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহীত ইট দিয়ে তৈরী । হাজিয়া সোফিয়ার অন্দর এমনভাবে বিশাল বিশাল মার্বেল পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরী যে এটি চলমান পানির ধারা বুঝাতে ব্যবহৃত হয় । এর ১০৪ টি পিলার গ্রীসের আর্টিমিস মন্দির থেকে এবং মিশরের মন্দির থেকেও সংগৃহীত হয়। এটি ২৬৯ ফুট লম্বা এবং এর প্রস্থ ২৪০ ফুট, এর সর্বোচ্চ গম্বুজটি ১৮০ ফুট লম্বা। প্রধান গম্বুজটির সাথে আছে ২টি সেমি গম্বুজ এবং এদের দেয়াল গুলো তৎকালীন বাইজেন্টাইন মোজাইক, সোনা, রূপা, কাচঁ, টেরাকোট এবং রংবেরং এর পাথর খ্রিস্টানদের বাইবেলের (গসপেল) সুপরিচিত দৃশ্য ও আকৃতি সম্বলিত। হাজিয়া সোফিয়ার উপরে সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঠি যেখান থেকে তৎকালীন সময়ে মহিলারা মূল গম্বুজ ঘরের অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। আমাদের গাইড আমাদেরকে জানালেন একে Holy Wisdom বলা হয়। সেই সময় হাজীয়া সোফিয়া ইস্তাম্বুলের গুরুত্বপূর্ন নিদর্শন হওয়ার আরো যে কারণ গুলো রয়েছে তা হলো এখানেই সম্রাটদের মুকুট পরানো হতো, রিফুজিরা আশ্রয় নিতো এবং ধনরত্ন লুকিয়ে রাখা হতো। অতঃপর মনোমুগ্ধকর হাজিয়া সোফিয়া পরিদর্শন শেষে এর নিকটে অবস্থিত ঐতিহাসিক ব্লু (Blue) মসজিদ দেখার জন্য আমরা ছুটে চললাম । ব্লু মসজিদ এর সামনে বিশাল পার্ক আছে যা সুলতান মেহমেত পার্ক নামে সুপরিচিত। সেখানে ঠাণ্ডা পানি পান করার এবং অজু করার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা পানি পান করে এবং অজু করে ব্লু মসজিদে যোহরের নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নিই। ইতিমধ্যে যোহর নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। একে সুলতান আহমদের মসজিদও বলে। এর ভিতরের নীল রং টাইলসে সুসজ্জিত হওয়ায় একে ব্লু মসজিদ বলা হয়। বিশাল আকৃতির এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৬১৬ সালে। হাজিয়া সোফিয়া মুসলিম শাসনের করায়াত্তের দীর্ঘদিন পর, এটি মাত্র ১৯ বছর বয়স্ক সুলতান আহমেদ এর আগ্রহে নির্মিত হয়। তিনি হাজিয়া সোফিয়া থেকেও আরো দৃষ্টিনন্দন মনোগ্রাহী মসজিদ তৈরী করার অভিপ্রায় করেন। যার ফলে এই মসজিদ তৈরী হয়। হাজিয়া সোফিয়া ও এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এটি আজো মসজিদ রূপে ব্যবহৃহ হচ্ছে এবং পর্যটকরা এটিকে সম্মানের সাথে দেখে । এ মসজিদে ৬টি মিনারেট রয়েছে যার উচ্চতা ৬৪ মিটার বা ২১০ ফুট। এর ধারন ক্ষমতা ১০,০০০ লোক। এর আর্কিটেকচারেল ডিজাইনের বিশেষত্ব গুলো হচ্ছে এর বাহির নীল এর ছোঁয়া না থাকলেও এর ভিতরে নীল রং এর টাইলসে আবৃত। সুলতানামেত মসজিদ সুলতান আহমেদ এর নামকরণে রাখা হয় যিনি এটির উদ্যোক্তা যা হাজিয়া সোফিয়ার চেয়েও দৃষ্টিনন্দন করার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তিনি বানাবার পরিকল্পনা করেন। বর্তমানে উভয় মসজিদই তাদের অসাধারণ শৈল্পিক ডিজাইন নিয়ে কাছাকাছি অবস্থিত। তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে এর নির্মাণ কাজ শুরু করলেও সর্বদা তা দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তাগাদা দিতেন । তা নির্মাণের ১ বছর পর মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান। এই মসজিদকে ঘিরে মাদ্রাসা, হাসপাতাল, প্রাইমারী স্কুল, বাজার, ইমারত এবং সুলতান আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী, তিন পুত্রের মাজার ছিল কিন্তু উনিশ শতকে এর অধিকাংশই ভঙ্গুর হয়ে যায়। সাধারন মসজিদ গুলোতে ১,২ বা ৪টি মিনার থাকে। কিন্তু ব্লু মসজিদের বিশেষত্ব বাড়াবার জন্য ৬টি মিনার নির্মান করা হয়। জানা যায় সুলতান প্রকৃতপক্ষে সোনার (Altiu তুর্কি ভাষায়) মিনার তৈরী করতে বলেন কিন্তু আর্কিটেক্টরা একে ছয় (Alti)টি ভেবে ৬টি মিনার নির্মাণ করার কথা মনে করেন। ফলে মক্কার হেরেমের সম্মান রক্ষার জন্য সুলতান তাতে ৭টি মিনার তৈরী করার জন্য আর্কিটেক্টদের সেখানে পাঠান। মসজিদের পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার বৃহৎ । কিন্তু উত্তর দিকে ছোট প্রবেশ দ্বার রাখা হয় যাতে অমুসলিমরা এবং যারা নামাজ পড়েন না তারা মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করে মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। ব্লু মসজিদের ভেতরে ২৬০টি জানালা দিয়ে আলোকিত করা হয়েছে । এগুলো ১৭ শতকের কারুকার্য খচিত গ্লাস দিয়ে তৈরী। দুর্ভাগ্যবশত এগুলো হারিয়ে যায় এবং এর প্রতিরূপ তৈরী করা হয়েছে। মসজিদে ২০,০০০ টি ব্লু টাইলস দিয়ে উঁচু সিলিং পর্যন্ত ঢাকা হয়। টাইলসগুলোতে ফুল, গাছ এবং বিভিন্ন প্যাটার্ণ বা ডিজাইন ১৬ শতকের ইজিনিক ডিজাইন স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০০৬ সালে ক্যাথোলিক চার্চের প্রধান পোপ বেনিডফট ১৬তম এই মসজিদ পরিদর্শন করেন । এটি ইতিহাসে একজন পোপের ২য়বার মসজিদ পরিদর্শন ছিল । তিনি এসময় লেখেন “তুর্কী হতে পারে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন এবং সহযোগী।” আর এই ভাবেই দুই ইমারত, দুই ধর্ম এবং শত শত বছর নিয়ে একটি মাত্র ইতিহাস রচিত হয়। আমরা জোহরের নামাজ আদায় করে মসজিদের ভিতরের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য অবলোকন করি। মহিলা ও পুরুষদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। উল্লেখ্য দোলমাবাগচী কিংবা হাজীয়া সোফিয়া বা ব্লু মসজিদ যেখানেই পরিদর্শন করতে গিয়েছি আমাদেরকে জুতার উপর পড়ার জন্য পলিথিনের দেয়া হয়। শুধু ব্লু মসজিদে জুতা রাখার জন্য পলিথিন রাখা হয়। দোলমাবাগচীতে ও হাজীয়া সোফিয়ায় টিকেট কেটে প্রবেশ করতে হয় । আমাদের সুচতুর গাইড পূর্বে নেটে বুকিং দেওয়ায় লম্বা লাইন উপেক্ষা করে খুব দ্রুত এ কাজ সারেন। ব্লু মসজিদ দেখে বার বার মনে হচ্ছিল এমন জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদে খুশু খুজু সহকরে করে নামাজ আদায় করা সত্যি দুস্কর । প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সেই হাদীসের কথা মনে হলো যে তিনি বলেছিলেন এমন এক সময় আসবে যখন মসজিদগুলো হবে নয়ানাভিরাম কিন্তু এর ভিতরটা থাকবে ফাঁকা বা অন্তসারশূন্য (তাকওয়াবিহীন)। বিশ্ব নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সেই ভবিষ্যদ্বানী যেন প্রতিফলিত হচ্ছে। অতঃপর তিনটি স্পটের সফর শেষে আমরা মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য ছুটে চলি নতুন স্বাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। সবাই প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। খুব কম সময়ের মধ্যে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে একের পর এক রেস্টুরেন্ট অবস্থিত। আমাদের গাইড তাঁর পরিচিত রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায় এবং সবাইকে যার যার পছন্দনীয় ডিস অর্ডার করার জন্য হাতে মেন্যুলিস্ট ধরিয়ে দেয় । রেস্টুরেন্টের মালিক হাসিমুখে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানায়। ভাষাগত সমস্যার কারণে গাইড ইনজি ইংরেজীতে আমাদের থেকে জেনে নিয়ে কোনটার স্বাদ কেমন হবে তা মালিক থেকে জানবার চেষ্টা করছিল। তুরস্কে আসার পূর্বে বহু বইয়ে তুরস্কে সফর করা লেখকদের শিষকাবাব এর অসাধারন স্বাদের কথা পড়েছি তাই আমি শিষকাবাব অর্ডার দিলাম। উল্লেখ্য ইস্তাম্বুলে যে কোন তুর্কী রেস্টুরেন্টে প্রথমে তাদের নির্ধারিত Appetizer সার্ভ করা হয়। অতঃপর মেইন ডিস পরিবেশন করা হয়। সাধারণত সুইট ডিস এ তাদের ট্র্যাডিশনাল মজাদার বাখলাবা পরিবেশন করে। আমরা সকলে তৃপ্তির সাথে লাঞ্চ সেরে নিই। খাবার শেষে ঐতিহ্যবাহী তুর্কি চা দেয়া হয় মূল্য ছাড়া । আমাদের গাইড ইনজি আজকের দিনের মতো হোটেলে নামিয়ে আমাদের থেকে বিদায় নেয়। কিন্তু যাওয়ার পূর্বে জানায় বিকেল ৭টার পূর্বে গাড়ি আমাদেরকে নিতে আসবে বসফরাস ত্রুজ ডিনারের জন্য। আমরা যেন যথাসময়ে হোটেল লবীতে উপস্থিত থাকি। তখন বাজে বিকাল ৫ টা। ২ঘন্টা হোটেলে গোসল সেরেও বিশ্রাম নিয়ে আমরা যথাসময়ে ৭টায় নীচে নামি। উল্লেখ্য তারা ভীষণ সময়ানুবর্তী। যখন যে সময় দিয়েছে ১ সেকেন্ড এদিক সেদিক হয়নি। আমরা সবাই খুব এক্সসাইটেড ছিলাম। ইস্তাম্বুলে এশিয়া ও ইউরোপ অংশকে যে ব্রীজটি সংযোগ করে তা ফাতিহ্‌ সুলতান মেহমেত ব্রীজ নামে পরিচিত। আগের দিন রাতে ইস্তাম্বুল পৌঁছলেও এ ব্রীজ পার হওয়ার সময় ক্লান্ত থাকার কারণে উপলব্ধি করতে পারিনি । কিন্তু আজ যখন ব্রীজটি পার হচ্ছিলাম দুই মহাদেশের (এশিয়া ও ইউরোপ) মাঝখান অতিক্রম করার সময় দারুণ অনুভূতি লাগছিল । আল্লাহ সুবহানুওয়াতালার কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছিলাম এমন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে। গাড়ী আরো দুই জায়গা থেকে ট্যুরিস্ট সংগ্রহ করে আমাদেরকে ৩ ঘন্টার এই ক্রুজ যাত্রার জন্য গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। বসফরাস ত্রুজ একটি ৩ তলা বিশিষ্ট ছোট জাহাজ। জাহাজের টপ ফ্লোরে ডিনারের এবং এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থা আছে। আমাদেরকে তাদের ঐতিহ্যবাহী হালুয়ার মতো ছোট ছোট মিষ্টির টুকরা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। অতঃপর সিঁড়ি ধরে আমরা দোতলায় উঠে যাই। তখন রাত ৮টা কিন্তু চারিদিকে আলোকিত। দোতলার অর্ধেকটারও বেশী খোলা আকাশের নীচে বসার ব্যবস্থা আছে। উল্লেখ্য প্রবেশমুখে অভ্যর্থনার সময় আমরা সাজানো সিংহাসনে সুলতান সুলেমান ও হুররাম সুলতানের মতো রাজকীয় পোশাক পাগড়ী পরিহিত অবস্থায় হাসিমুখে সিংহাসনে বসা দুইজনকে দেখতে পাই । সবাই তাদের সাথে ছবি তুলছিল। ৮টা ৪০ এ মাগরিবের আজানের ধ্বনি শোনা যায়। আমরা জাহাজে নামাজ আদায় করে নিই। ঠিক রাত ৯টা বাজে জাহাজ ছেড়ে দেয়। বসফরাসের বুকে জাহাজ ছুটে চলতে থাকে। চারিদিকে আঁধার ঘনিয়ে আসে। বসফরাসের দুই পাশেও ইস্তাম্বুল আলো ঝলমল করতে থাকে। দিনের ইস্তাম্বুলের এক রকম সৌন্দর্য আর রাতের ইস্তাম্বুলের সৌন্দর্য আরেক রকম। প্রসঙ্গত ফুলে ফুলে গোটা ইস্তাম্বুল আবৃত। কোথাও একটা শুকনো পাতা পড়ে থাকতে দেখিনি। মালীরা সারাদিন গাছগুলোর পরিচর্যা করে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চারপাশ, যেন সৃষ্টিকর্তা ফুলের সৌন্দর্যের নেয়ামত এ শহরে ঢেলে দিয়েছেন। ২৪ ঘন্টা ইলেকট্রিক ট্রাম আর বড় বড় বাস কিছুক্ষন পর পর শহরের নিদির্ষ্ট স্পটগুলোতে থামে। নেটের মাধ্যমে তা সহজে জানা যায়। ১ সেকেন্ড এদিক সেদিক হয় না। শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা খুব দ্রুত ও সহজে চলাচল করা যায়। অতি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোথাও ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যাম সৃষ্টি হতে দেখিনি। বিশাল বিশাল রাস্তা। সুরম্য প্রাসাদ আর নয়নাভিরাম মসজিদে ঘেরা, পাহাড়ে ঘেরা এক অপরূপ এবং সুন্দর দেশ। জাহাজ শান্ত বসফরাস এর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতিহ্‌ সুলতান ব্রীজ অতিক্রম করে ছুটে চলছে। বসফরাসের দু পাশে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কটেজ বাড়িগুলো খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। এছাড়াও ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন নিদর্শনগুলো যেমন: ব্লু মসজিদ, কিজ কুলিসি টাওয়ার, দোমলাবাগচী প্রাসাদ সূর্যাস্তের সময় সোনার মতো ঝলমল করছিল। রাত বাড়তে থাকলে দুইপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ক্ষুধাও লাগে। আমরা উপরে ডিনার করতে যাই । সেখানেও যার যার পছন্দ মতো মেইন ডিস অর্ডার নিয়ে পরিবেশন করা হয়। হঠাৎ খাবার মাঝখানে তাদের ট্র্যাডিশনাল মিউজিক এর আওয়াজ শোনা যায় এবং ডিনার রুম এর মাঝখানের স্পেসে ২ তরুণ-তরুনী নাচতে নাচতে উপবিষ্ট হয় । এভাবে কিছুক্ষন পর রাত বাড়ার সাথে সাথে তাদের নাচের উদ্দমতা বাড়তে থাকে। নাচের বিষয়বস্তু দেখে মনে হলো তা ফোক নৃত্য এবং তাদের বিবাহ অনুষ্ঠানের রীতি, পুরুষদের শৌর্যবীর্যতা প্রদর্শন এবং ঐতিহ্যবাহী তুর্কী নৃত্য প্রদর্শিত হয়। হঠাৎ আমার প্রচন্ড মাথাব্যাথা শুরু হয় এবং বমি বমি ভাব লাগে । আমি দ্রুত নীচে নেমে আসি। রাতের খোলা আকাশের নীচে নেমে আমার মন উদাস হয়ে যায়। ভীষণভাবে আম্মার কথা (যিনি গত বছর মারা যান) মনে পড়তে থাকে। দু’গাল বেয়ে আলো আধাঁরেতে অশ্রু ঝরে পড়ে। আল্লাহর কাছে আম্মার জন্য দোয়া করতে থাকি, ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানিছ ছাগীরা’ । আল্লাহ্‌ দুনিয়ার যে সৌন্দর্যগুলো আম্মাকে দেখাননি পরকালে যেন তার চেয়েও অনেক ভালো কিছু দেখান। স্বয়ং আল্লাহই তো বলেছেন যা চোখ কখনো দেখেনি, কান কখনো শুনেনি, মন কল্পনা করেনি এমন জিনিস দিয়ে আল্লাহ্‌ তার প্রিয় বান্দাদের জন্য বেহ্শেত বানিয়েছেন। কাজেই দুনিয়ায় যারা দুনিয়ার রংরূপ দেখেনি তাদের আফসোসের কোন কারণ নেই। বরং তাদের আরো ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। শুধু এর বিনিময়ে আল্লাহর যথাযথ আনুগত্য করতে হবে। বাকি সময়টা আমি নিচে কাটাই । দলের অন্যান্যরাও পরে নিচে নেমে খোলা আকাশের নীচে সমুদ্রের দু-পাশের দৃশ্য অবলোকন করতে থাকে। উল্লেখ্য নৃত্য পর্ব শুরু হবার পূর্বে সেখানে এক তরুণী (জানতে পারি সে স্টুডেন্ট এবং এক্সপার্ট ফটোগ্রাফার) বিভিন্ন টেবিলে (এজেন্সীর মাধ্যমে বুকিং দেয়া) তার দেখিয়ে দেওয়া বিভিন্ন পোজে সবার ছবি তুলতে থাকে। নৃত্য অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সে তা আগ্রহীদের কাছে বিক্রি করে । ছবিগুলো এতই সুন্দর হয়েছিল যে কেউ না বলতে পারছিলাম না । হঠাৎ সেখানে এক বাঙালী দম্পতির সাথে পরিচয় হয়। ভদ্রলোক আর্মিতে ছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার, ১ ছেলে ১ মেয়ে এবং স্ত্রী নিয়ে রমজানে সেনজেন ভিসা নিয়ে পুরো ইউরোপ ঘুরে শেষ যাত্রা ইস্তাম্বুল হয়ে ২ দিন পর দেশে ফিরবেন। ভদ্রমহিলা খুব হাসিখুশি এবং খুব কথা বলেন। অল্প সময়ে সবাইকে আপন মনে হচ্ছিল। এমনিতে আসা অবধি ইস্তাম্বুলে কোন বাঙালী ট্যুরিস্টের দেখা মেলেনি তাই দেশী মানুষ পেয়ে খুব ভালো লাগছিল। অবশেষে নানা রকম আলোর খেলায় রং বদলানো ফাতেহ্‌ ব্রীজ পার হয়ে আমরা আবার ফিরে চল্লাম। আমাদের গাড়ীও চলে এসেছে। সুচতুর ড্রাইভার আমাদেরকে খুঁজে বের করে ফেলে। আমরা আরো অভিজ্ঞতার সন্ধানে আগামী দিনের জন্য মনকে ও শরীরকে চাঙ্গা করতে রাত ১২টা বাজে হোটেলে ফিরে আসি। রাতে এশার নামাজ সেরে নিই। পরদিন সকাল ৯টায় গাইড ইনজি নিতে আসবে। তাই ঘড়িতে এলার্ম সেট করে ঘুমোতে যাই। এভাবে আমাদের প্রথম দিনের ইস্তাম্বুল ট্যুরের সমাপ্তি হয়। সবাই আমরা দারুণ উপভোগ করি এবং ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়ি । পরের সংখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তোপকাপী যাদুঘর সহ অন্যান্য চমৎকারস্থান সমূহ পরিদর্শন সংক্রান্ত তথ্য পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করবো । ইন-শা-আল্লাহ্‌ ।

লেখকঃ প্রিন্সিপ্যাল, চট্টগ্রাম ভিক্টোরী ন্যাশনাল স্কুল সিভিএনএস এবং কলামিস্ট ও নারী উন্নয়নকর্মী ।

Top