” দু’মুঠো স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে”

received_1905504919741882.jpeg

মাসুম সরকার আলভী,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

ইউনিভার্সিটির সবুজ ক্যাম্পাস। ব্যস্ততার এক জীবন। গ্রুপস্টাডি, এ্যাসাইনমেন্ট, টিউটোরিয়ালের ভিড়ে সময়ের ফুরসত মেলা ভার। মাঝেমধ্যেই অভিপ্রায় মাখি কোথাও বেড়াতে যাব। দিন শেষে সংকল্পটা ধরা ছোঁয়ার বাহিরেই রয়ে যায়। পড়াশোনার চাপে ভুলে যাই সবকিছু। আম্মু মাঝেমধ্যে ফোন করে বাড়িতে যাওয়ার কথা বলেন। এই সেই ব্যস্ততা দেখিয়ে খানিকের জন্য মুক্ত হই।

এইতো সেদিন বিকেলে সাদ্দাম হোসেন হলের মাঠে ছোট বাঁচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলাম। হঠাৎ ওদিক থেকে একজন হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে ডাকলেন। একটু এগিয়ে যেতেই দেখি সাইমুম। ভূমিকা না টেনেই জিজ্ঞেস করল— ট্যুরে যাবি? কথাটা শুনেই আমি তো আনন্দে আত্নহারা! এমন একটা মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় ছিলাম যেন। বিএনসিসি ক্যাডেটদের গেস্ট হিসেবে ট্যুরে যাব ভাবতেই একটু অন্যরকম অনূভুতি। মহাস্মৃতিবিজড়িত স্থান মেহেরপুর যাচ্ছি ঠিক হয়ে গেলো। গুছিয়ে নিলাম নিজেকে। ক্যাম্পাসের লাল সবুজ বাসে বড় ভাইয়া আপুদের সাথে জীবনে প্রথম ভ্রমণ। ছেলে ও মেয়ে দুই গ্রুপ হয়ে গানের কলি খেলা নিয়ে বেশ অানন্দ হল। বেসুরা নতুন কণ্ডের ছোঁয়া পেয়ে গানগুলো যেন নবরুপ লাভ করছিলো। কুপনের টিকেট বিক্রি করা ট্যুরের আরেক অানন্দ। কুপন কেনার সময় এক আপুর সাথে পরিচয় হলো। আপু দেখতে খুবই সাধারণ। এমন একজন সাধারণ মানুষ দেখতে পাওয়াই কিন্তু আজকাল অসাধারণ।

আপুর মুখটা যেন সূর্যমুখী ফুলের মত। হাসিমুখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। মায়াবী চাহনি। প্রথম প্রথম কারো নজর পড়লে রবী ঠাকুরের হৈমন্তী মত মনে হবে। আপু আদর করে আমাকে কাছে নিয়ে বসালেন। আমি দেখতে ছোটই। মাঝেমধ্যে আমার বন্ধুরা অপরিচিত কোথাও গেলে আমাকে ছোট ভাই হিসাবে পরিচয় দেয়। বলে এবারই ক্লাস নাইনে উঠলো। কথাটা নিঃসন্দেহে সবাই মেনে নেয়। এই সূত্র ধরেই আপুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ছোট ভাইয়ের মতই যতক্ষণ একসঙ্গে ছিলাম আমাদের মধ্যে খুনসুটি লেগেই ছিল। এতটুকু সময়ে যেন আমরা খুব বেশি আপন হয়ে গেলাম।

সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে লাল টকটক করছিল তখনই রওনা হলাম ক্যাম্পাস পানে। ফেরার পথে সবাই যেন ক্লান্ত। আপুকে পেয়ে আমি খানিকের জন্যেও ক্লান্তি অনুভব করিনি। আপু আমি পাশাপাশি সিটেই বসেছি। বিরতিহীন আলাপ চললো আমাদের। আলাপচারিতার এক সময় পরিবারের কথা বলতেই সূর্যমুখী ফুলের গায়ে যেন সন্ধ্যা নামলো। আমিও ব্যথা অনুভব করলাম। আমি মাথাটা নিচু করে ভাবছি আর আপু নরমকণ্ঠে বলতে আরম্ভ করলেন—ভাইয়া আব্বু নেই। ছোট থাকতেই আব্বুকে হারিয়েছি। আম্মুটাও অসুস্থ। বড় ভাই আছেন মাস্টর্সে পড়ছে। নানু আমাদের বাড়িতেই থাকেন। এখন পরিবার বলতে আমরা চারজনই। আমি নিচু কণ্ঠে জানতে করলাম কি করে চলে আপনাদের সংসার? আপু হতাশগলায় বললেন আল্লাহই চালান ভাইয়া। আম্মুর ঔষুধ আমার ভাইয়ার পড়া-লেখা সব মিলিয়ে দিনগুলো খুব ….।
যাইহোক, স্বপ্নই মানুষকে বাঁচতে শেখায় ভাইয়া। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। সকল প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে আপু এ বছরের শেষে অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রোস্টগ্রাজুয়েশন করবেন। প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন তার নিজের চেয়ে বড়। স্বপ্ন নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগায়।

Top