রোহিঙ্গা হত্যা ও ধর্ষণের বিবরণ অকল্পনীয়: জাতিসংঘ মহাসচিব

36563327_1583159171810906_7484044821825323008_n.jpg

আবদুর রাজ্জাক,কক্সবাজার:
কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে এসে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের দু:খ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখলেন ও তাদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা নিজের কানে শুনলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ঘোরার ফাঁকেই ফাঁকেই জাতিসংঘ মহাসচিব এক টুইটে বললেন তার অভিজ্ঞতার কথা।তিনি লিখেছেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে হত্যা আর ধর্ষণের যে বিবরণ তিনি শুনেছেন তা অকল্পনীয়।“তারা বিচার চায়, নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে চায়।
সোমবার(০২ জুলাই) কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে টুইটে একথা বলেন তিনি। সকালে ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবার আগে জাতিসংঘের মহাসচিব আরেকটি টুইটে বলেন, রোহিঙ্গারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বঞ্চিত ও নিগৃহীত একটি জনগোষ্ঠী।তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবিক ও মানবাধিকারে ক্ষেত্রে দুঃস্বপ্নের সংকট। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দিয়ে ঔদার্য প্রদর্শনের জন্য আমি বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই। বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের সার্বিক অবস্থা নাজুক হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে গুতেরেস আরো বলেন, আমি আজ বাংলাদেশ সফরের সময় রোহিঙ্গাদের মনে যে প্রত্যাশা দেখেছি তা বর্ষার পানিতে ধুয়ে যেতে দিতে পারি না। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য জাতিসংঘের প্রধান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমকে সঙ্গে নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে সোমবার সকাল পৌনে ৯ টায় কক্সবাজার পৌঁছেন। কক্সবাজারে নেমে প্রথমে হোটেল সাইমন বিচ রিসোর্টে যান তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে তাদের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেন। এরপর তারা যান উখিয়ার কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্প। মূলত নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ওই ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখানে নিবন্ধন শেষে তাদের পাঠানো হয় ক্যাম্পে।ট্রানজিট ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন গুতেরেস ও কিম।রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপো গ্রান্ডি, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মুরার উপস্থিত ছিলেন।
গত বছর আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ওই দেশের সেনা অভিযান শুরুর পর গত দশ মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। গ্রামে গ্রামে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া গেছে তাদের কথায়। সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিসংঘ বর্ণনা করে আসছে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলে আসছে,বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা শরণার্থীরা যাতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে এবং এই প্রত্যাবাসন যাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে হয়, তা নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে মিয়ানমারকে। রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে দুই দিনের সফরে শনিবার ঢাকায় আসেন আন্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম। তারা জানিয়েছেন,এ সঙ্কট এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর কথা বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব। আর রোহিঙ্গা সঙ্কটে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, এই সঙ্কট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও অনেক কাজ বাকি, আর সেজন্যই তিনি ও জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে এসেছেন।
জাতিসংঘ একে ‘জাতিগত নিধন’ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এর আগে অর্থাৎ ২০০৮ সালের ‘ইউএনএইচসিআর’-এর শীর্ষ পদে থাকা অবস্থায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশে এটাই তাঁর প্রথম সফর। তবে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম দুই বছর আগেই একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন।

Top