এরদোগানের জয় এবং তুরস্কের নির্বাচন সরেজমিনে যা দেখে আসলাম –জিয়া হাবীব আহ্‌সান

FB_IMG_1530004079396.jpg

ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক টাকসিম ময়দানে (স্বাধীনতা স্কয়ার) লেখকের নেতৃত্বে মানবাধিকার ভিজিটরস্‌ টিম

—————-
গত ১৮ই জুন থেকে ২৪ই জুন ’২০১৮ পর্যন্ত প্রাচীন সভ্যতার দেশ তুরস্কের ইস্তাম্বুল,কাপাডোকিয়া ও কোনিয়া প্রভৃতি অঞ্চল ভিজিটের সুযোগ পাই । মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন- বিএইচআরএফ’র ৮ সদস্যের উক্ত ভিজিটরস্‌ টিমের অন্যান্য সদস্যরা হলেন এডভোকেট মোহাম্মদ রফিকুল আলম,বিশিষ্ট ব্যাংকার জাহাঙ্গীর আলম,নারী উন্নয়ন কর্মী ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষা আশ্‌ফা খানম,অধ্যাপক রেজিনা খানম প্রমুখ।
ভিজিটরস টিমকে সার্বিকভাবে সহযোগিতায় ছিলেন ইস্তাম্বুল মারারা বিশ্ববিদালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী ছাত্র মোঃ জাবেদ,কোনিয়া সেলজুক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নত বাংলাদেশী ছাত্র মুহিবুল্লাহ ইদ্রিস,সাংবাদিকতায় ইস্তাম্বুল মারারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ছাত্র মোঃ ফয়সাল চৌধুরী ও তুর্কি গাইড এম এস ইঞ্জি ।

সফরকালে ইউরোপ এবং এশিয়ার সম্মিলিত দেশটির পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেখে আমরা বিমোহিত এবং আশ্চার্যানিত হই । নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণা যা বাংলাদেশ মানবাধিকার ভিজিটরস্‌ টিমের চোখে পড়েছে তা হল রাস্তায় সুন্দর সুন্দর ব্যানার ফেস্টুন টাংগানো, গাড়ি বহরে প্রার্থীদের ছবি ও দলীয় এবং জাতীয় পতাকা সম্বলিত বহর ও বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় নেচে গেয়ে প্রার্থী পক্ষে প্রচারণা চালানো । বিশাল বিশাল সমাবেশে প্রার্থীরা নিজের বক্তব্য প্রদান করেছেন,পাশাপাশি সমাবেশ দেখেছি কিন্তু কোথাও কোন উশৃংখল আচরণ চোখে পড়েনি । গণতন্ত্রের এমন সুন্দর নজির বিহীন নির্বাচনের দিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবার । নির্বাচনের দিন আলাদা বন্ধ নেই । ভোটের দিন ইস্তাম্বুল এবং কোনিয়ার বিভিন্ন ভোট সেন্টার দেখার সুযোগ হয় । কোথাও হুড়াহুড়ি,ধাক্কাধাক্কি দেখিনি । স্কুল কলেজগুলো ভোট সেন্টার । ভোট দিয়ে যার যার কাজে সে সে চলে যাচ্ছেন । তেমন কোন পুলিশ প্রহরাও নজরে পড়েনি । ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ । পরাজিত প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতি,স্বজন প্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনেননি । যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকেও হার মানায় । এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা পাঁচ কোটি ৬৩ লক্ষ ২২ হাজার ৬৩২ । স্থানীয় সময় সকাল ৮ টায় শুরু হয়ে ভোট চলে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত । আইডি কার্ড বা যে কোনোও শনাক্তকরণ নথি দেখিয়ে ভোট দিতে পারেন ভোটাররা । আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের প্রভাবের কারণে এ নির্বাচনে বিদেশী সাংবাদিকের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে । ৩৪টি দেশের ৬০০ এর বেশী সাংবাদিক ভোট গ্রহণের খবর সংগ্রহের জন্য উপস্থিত ছিলেন ।

তুরস্কের ২৪ তারিখের নির্বাচন পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে, সকল দলই নির্বাচনে আগের চেয়ে ভালো ফলাফল করেছে কিংবা প্রত্যাশিত ফলাফল করেছে কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু সাদাত পার্টির ক্ষেত্রে। ফলাফল নিয়ে একটু যদি ব্যাখ্যা করি তাহলে বিষয়টা আরেকটু খোলাসা হবে: ১. একে পার্টি ও সরকারী জোট: প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ৫২.৪০% ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন যা একে পার্টিতে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো রেজাল্ট। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে এরদোয়ান গত নির্বাচনের চেয়ে ভালো ফলাফল করেছেন যদিও এবার চ্যালেঞ্জ বেশী ছিল। পার্লামেন্টে সরকারী জোট ৩৪৩ টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়েছে। যেটা পাওয়ার ব্যপারে সবচেয়ে বেশী চ্যালেঞ্জ ছিল । একে পার্টির লোকদের ধারনা ছিল হয়তো সংখ্যাগরিষ্টতা পাবেনা অথবা পেলেও ৩০১-৩২০ টি আসন পাবে । কিন্তু এক্ষেত্রেও বড় সফলতা এসেছে তাদের । যদিও পার্লামেন্টে একে পার্টির ভোট কিছুটা কমেছে কিন্তু এটা অপ্রত্যাশিত ছিলনা কারন নির্বাচনের পূর্বে এমনটা কিংবা তারচেয়ে কিছু কম পাওয়ার আইডিয়া ছিল ।
সরকারী জোটে জাতীয়তাবাদী দলের প্রাপ্ত ভোট ও আসন রীতিমত বাম্পার ফলনের মত। গত নির্বাচনে তারা ১১.৯% ভোট পেয়ে ৪০ টি আসন পেয়েছিল। এরপর দল বিভক্তি দেখা দেয় এবং ইয়ি পার্টি নামে আরেকটি দল গঠিত হয়। ধারনা করা হচ্ছিল যে, তারা হয়তো ৭-৮% ভোট পাবে। কিন্তু তারা রীতিমত চমক দেখিয়েছে। ১১.১% ভোট পেয়ে ৫০ টি আসন পেয়েছে। ২. বিরোধী জোট: প্রথমেই আসি, সেক্যুলার সিএইচপির কথা। বিরোধী দল মানেই জিততে চায় কিন্তু তাদের ভোট কখনোই ২৬% এর উপরে ছিলনা (২০০২ সাল থেকে)। সেখানে তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ৩০.৮% ভোট পাওয়াটাও রীতিমত চমক। দল হিসেবে তাদের ভোট কিছুটা কমলেও আসন সংখ্যা গত নির্বাচনের তুলনায় ১২ টি বেড়ে ১৪৬ টি হয়েছে। (এই ভোট বাড়া কমার একটা সমীকরন আছে। আর তা হল, কুর্দীদের দলকে তারা পার্লামেন্ট নির্বাচনে কিছু ভোট দিয়েছে আর কুর্দীরা তার বিনিময়ে তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে।) দ্বিতীয়ত: ইয়ি পার্টি। গঠন হওয়ার ৭-৮ মাস পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৭.৮ এবং সংসদ নির্বাচনে ১০% ভোট পেয়ে ৪৪ টি আসন পাওয়াটা অনেক বড় বিষয়। যদিও তাদের ব্যাপক ফান্ডিং ছিল এবং পশ্চিমা মিডিয়ার ব্যাপক সহায়তা পেয়েছে, সেটা অন্য বিষয়। ৩. কুর্দীদের দল: এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে সংকটে ছিল কুর্দীদের দল। তারা পার্লামেন্ট ঢুকতে পারবে কিনা তা নিয়ে রীতিমত হইচই ছিল। কিন্তু তাদের ভোট ও আসন দুটোই বেড়েছে। এবার তারা ১১.৬% ভোট পেয়ে ৬৭ টি আসন পেয়েছে। উপরের এই দলগুলো যখন প্রত্যাশিত এবং প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল করেছে তখন একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছে সাদেত পার্টির ক্ষেত্রে। সাদেত পার্টি সেক্যুলারদের সাথে জোট করার পর সেক্যুলার মিডিয়াগুলো যখন একটু বেশী সম্মান দিতে লাগলো তখন তাদের পা মাটিতে পড়তো না। তারা ধরেই নিয়েছিল এবার তাদের বড় বিজয় হচ্ছে। তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিনিমাম ৭-১৫% ভোট পাবে এবং প্রথম দফার এরদোয়ান হারবেন তাতে দ্বিতীয় দফায় তারা চমক দেখাবেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠার সতের বছর পর সাদত পার্টি পার্লামেন্টে ঢুকতে পারবে। কিন্তু তা আর হইলো কই? প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পেয়েছে ০.৯০% ভোট আর সংসদে পেয়েছে ১.৪% (০০ টি আসন)। তুরস্কের গাজী ইউনিভার্সিটির পিএইচপি গবেষক হাফিজুর রহমানের মতে, এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি:- সাদেত পার্টির দীর্ঘদিনের দাবী ছিলো যে, সংসদে সিট পাওয়ার জন্য ১০% ভোট পাওয়ার যে বাধ্যবাধকতা তার কারনেই সাদেত পার্টি আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট পেতনা। এরদোয়ান সাদেত পার্টির ভয়ে ১০% কোটা উঠাচ্ছেন না!!! এবারের নির্বাচনে সাদেত পার্টির জন্য ১০% কোটা প্রযোজ্য ছিলনা। কারন সম্প্রতি করা নতুন নিয়মে যেকোন জোট ১০% এর উপরে ভোট পেলে জোটভুক্ত সকল দলই ১০% এর উপরে পেয়েছে বলে গণ্য হবে। আর ভোট সংখ্যার ভিত্তিতে আসন পাবে। কিন্তু সাদেত পার্টি কোন প্রদেশেই এমপি হওয়ার জন্য নূন্যতম ভোট পায়নি। আশা করি তারা তাদের ভোটের সঠিক পারসেনটেজ বুঝতে পেরেছে। সাদেত পার্টিতে এক ধরনের অহঙ্কারবোধ ছিলো যে, তাদের ভোটেই এরদোয়ানের জয়-পরাজয় নির্ভর করে। তাদের এই ১-২% ভোট যে দিকে যাবে সেদিকেই বিজয় হবে। সম্ভবত এই নির্বাচনে সেই অহঙ্কারবোধটা রোধ হবে।

গনভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় প্রবেশের পর এটাই তুরষ্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন। গত ১৬ বছরে শাসনামলে এবারই প্রথম এরদোয়ানের মোকাবেলায় শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠিত হয়েছে। মেয়াদের আগে নির্বাচন দেওয়া এরদোগানে সৎ সাহসের পরিচয় । ১৯২৪ সালে আধুনিক তুরষ্কের যাত্রার পর হতে এরদোয়ানের দল এ.কে.পি জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সফলতার সাথে তুরষ্ককে শাসন করে যাচ্ছে। ২০০২ সালে এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগে “ইউরোপের রুগ্ন দেশ” হিসেবে পরিচিত কট্টর ধর্মহীন সেক্যুলার রাষ্ট্র তুরষ্কের ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জনগনকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রদানের মাধ্যমে অধিকাংশ জনগনের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়। একই সাথে সেনা ক্যু এবং অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা সমাধান করে জনমুখী উন্নয়নের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকলেও বিদেশী শক্তিগুলোর ষড়যন্ত্রে সম্প্রতি তুরষ্কের অর্থনীতিতে ১২% মুদ্রাস্ফীতি, ইউরোপে এরদোয়ানের প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা, সিরিয়ান রিফিউজি ইস্যু এবং বিরোধীদল গুলোর প্রথমবারের মত জোটবদ্ধ লড়াইয়ের কারনে সংসদীয় নির্বাচনে ৬০০ আসনের মধ্য ৩০০ এর অধিক আসনে বিজয়ী হওয়া অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ালেও এরদোয়ানকে এই মুহূর্তে পরাজিত করাটা ছিল অনেক কঠিন। বিরোধীজোটের কৌশলগত প্রার্থী প্রদান ছিল সংসদ নির্বাচনে বড় একটা হুমকি। এরদোয়ানের আসনগুলো দখল করলে বিরোধীজোট বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত কৌশলে নিজেদের প্রতিক এবং দল পরিবর্তন করে প্রার্থী দিয়েছিল। ইতিমধ্য ইসলামপন্থী দল সাদাত পার্টির ৬ জন প্রার্থী আতার্তুকের সিএইচপি থেকে প্রার্থী হয়েছে। কোনিয়া প্রদেশে সিএইচপির ২ নং প্রার্থী হিসেবে সাদাত পার্টির যুব শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল কাদির কারাদুমান, কায়সেরি প্রদেশে ২নং প্রার্থী হিসেবে আহমেদ ইলদিস, ইস্তাম্বুল প্রদেশে ৯ নং প্রার্থী হিসেবে সিভাস প্রাদেশিক যুব শাখার সভাপতি নাজির জাহাঙ্গীর, ইস্তাম্বুল ১১ নং প্রার্থী হিসেবে হুসাইন এমরে, সামসুন প্রদেশে ৩ নং প্রার্থী হুসাইন শাহীন, ট্রাবজোন প্রদেশে সাদাত পার্টির প্রাদেশিক ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল কাদির চেলেবি সিএইচপি থেকে প্রার্থী হয়েছে। এছাড়াও ইস্তাম্বুল প্রদেশে সাদাত পার্টির ১ নং প্রার্থী হিসেবে কুর্দিশ জাতিয়তাবাদী দল এইচডিপির সাবেক এমপি আলতান তান প্রার্থী হয়েছে। বিরোধীজোটের কৌশলগত প্রার্থী প্রদানে এরদোয়ানের ৪০-৫০ আসনে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা ছিল । এরপরও বিরোধীদলের সকল পরিকল্পনা এরদোয়ানের ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের কাছে পরাজিত হবার সম্ভাবনাই বেশি ছিল যে সমস্ত কারনে এরদোয়ান পুনরায় বিজয়ী হওয়া সম্ভব হয়ঃ- এরদোয়ানের উন্নয়ন পলিসি: আদর্শিক কারনে যারা এরদোয়ানকে অপছন্দ করে তারাও এরদোয়ানের নেতৃত্বে ইউরোপের ন্যায় তুরষ্কের উন্নয়ন পলিসিকে পছন্দ করে। শিক্ষা, চিকিৎসা সহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে এরদোয়ান জনগনের হৃদয়ে যে অবস্থান করে নিয়েছে তা এতো দ্রুত ভেংগে পরার কোনো সম্ভাবনা নেই । সাম্প্রতিক সফল পররাষ্ট্রনীতি: ইউরোপ এবং আমেরিকার সাথে ভালো সম্পর্ক না থাকলেও সম্প্রতি বছরগুলোতে ইরান, রাশিয়া এবং চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। গত তিন মাস আগে সিরিয়ার আফরিনে সফল অভিযান সাধারন তার্কিশদের মনে এরদোয়ানের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। পিকেকে বিরোধী অভিযান: গত কয়েক বছরে পিকেকের আত্মঘাতি হামলায় তুরষ্কের কয়েক শতাধিক জনগন নিহত হয়েছে। গত বছরে সরকার বেশ কয়েকটি অভিযানে পিকেকের শক্তিশালী কিছু ঘাটি ধ্বংশের পাশাপাশি বড় সংখ্যক সন্ত্রাসীদের সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছে। পিকেকের উপস্থিতিতে পুর্ব তুরষ্কে কখনোই শান্তিপূর্ণ ভাবে জনগন ভোট দিতে পারতো না। অধিকাংশ সন্ত্রাসীদের অনুপস্থিতিতে কুর্দিশ অধ্যুষিত পূর্ব তুরষ্কের ধার্মিক কুর্দিশদের ভোট অতিতের ন্যয় এরদোয়ান পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর যদি কুর্দিশ দল এইচডিপি জাতীয়ভাবে ১০% এর কম ভোট পেলে তারা আর কোনো আসন পেত না। সেক্ষেত্রে এই অঞ্চলের ৯০% আসন ২০০২,২০০৭ ও ২০১১ এর ন্যায় এরদোয়ানের একে পার্টির ঘরে চলে আসে । সেক্ষেত্রে এরদোয়ানের আসন সংখ্যা ৩৪৩ পেরিয়ে যায় । এরদোগান যদি ৫০% ভোট না পেতো তাহলে তাকে আবার আগামী ৮ই জুলাই পুনরায় নির্বাচন দিতে হতো । অর্থাৎ ৬০০ তা আসনের মধ্যে কমপক্ষে ৩০১ তা না পেলে কোয়ালিশন করতে হবে নইলে ২ মাসের মধ্যে পুনঃসংসদ নির্বাচন দিতে হবে । ৫০% ভোট না পেলে প্রেসিডেন্টকেও পুনরায় নির্বাচন করতে হবে । প্রেসিডেন্ট কোয়ালিশনের কোণ সুযোগ থাকে না । প্রেসিডেন্ট এরদোগান দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার জন্য আগাম নির্বাচন দেন । কুর্দিশ ১০% এর বেশী অর্থাৎ ১১.০৬% ভোট পাওয়ায় তারা পার্লামেন্টে ৬৭ টি আসন পেল যা এরদাগানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ । কারণ ১০% ভোট না পেলে ঐ দল পালার্মেন্টে কোন আসন পাবে না । বিদেশী ভোটে পূনর্জাগরণ: ইউরোপের দেশ সমূহ এরদোয়ানের সকল প্রকার প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সাথে পুলিশের সহযোগীতায় বিরোধীদল প্রচারণা চালাচ্ছে। তার্কিশদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণকারী ইউরোপীয়ান শক্তিদের এমন ব্যবহারে সামগ্রিকভাবে এরদোয়ান ও একে পার্টির জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরষ্কের ধার্মিক এবং নারী ভোট: এমন এক সময় ছিলো যখন তুরষ্কে আযান চালুর কারনে প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিলো, ইফতার প্রোগ্রামের কারনে নাজিমুদ্দিন আরবাকানকে পদচ্যুত করা হয়েছিলো, দীর্ঘ কয়েক দশক সাধারন নারীরা বোরকা পরার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলো। লিবারাল মুখোশে এরদোয়ান ধারাবাহিকভাবে তুরষ্কের সাধারন মানুষের ধর্মীয় অধিকার ফিরে দেয়ার পাশাপাশি তাদের গৌরবের ওসমানী খিলাফতের অনেক কিছুই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তুরষ্কের এই ধার্মিক শ্রেনীর মানুষদের ভোট অতীতের ন্যায় এবারো এরদোয়ান পক্ষে যায় । এছাড়াও এরদোয়ান তুরষ্কের নারীদের মধ্য অসম্ভব রকম জনপ্রিয়। নারীদের এই ভোটগুলো সহজে হাতছাড়া হতে দেয়নি এরদোগানের দল । গ্রামীন ও মধ্যবিত্ত ভোট: তুরষ্কের শহরের ভোটে এরদোগান এবং অন্যান্য দলগুলোর মধ্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার কখনো এরদোগানের কম ভোট পেলেও সমগ্র তুরষ্কের গ্রামীন ভোটগুলো একচেটিয়া একে পার্টি তথা এরদোয়ানের ঘরে যায়। এবারো এর ব্যতিক্রম হবার তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। এটা সত্য যে তুরষ্কের এলিট শ্রেনীর ভোটগুলো সিএইচপির তথা আতার্তুকের দলে গেলেও সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত এবং ধার্মিক শ্রেনীর মানুষদের ভোটগুলো আবারো এরদোয়ান পায় । গত ২৪ জুন উন্নয়ন আর “নিও অটোমানিজমের” ধর্মীয় চেতনায় উজ্জীবিত জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পুনরায় তুরষ্কের শাসন ক্ষমতায় এরদোয়ান দেশকে এগিয়ে নেবে । এটাই বেশিরভাগ টার্কিশ জনগনের বিশ্বাস। বর্তমান সময়ে তুরস্কের এ নির্বাচনে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র চর্চার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লিখা থাকবে ।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

Top