সাগরের ঢেঁউয়ের থাবায় বিলিন হচ্ছে বেড়িবাঁধ , অাতংকে মাতারবাড়ীর দ্বীপবাসী

IMG_20180624_000614.jpg

অাবু বক্কর ছিদ্দিক,মহেশখালী:

কক্সবাজারের মহেশখালীতে একের পর এক মেঘা মেঘা উন্নয়ন প্রকল্পে পাল্টে যাচ্ছে এ উপজেলার চিত্র । বিশেষ করে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে ১৪’শ ও ১২’শ মেঘাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে । ইতিমধ্যে মাতারবাড়ীর দক্ষিণে ১৪’শ মেঘাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ প্রায় ৩০% সমাপ্ত হয়েছে । অার মাতারবাড়ীর পশ্চিমে নৌ-বন্দর নির্মাণেরর জন্যও চলছে জরিপ কাজ । সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী হতে যাচ্ছে মিনি সিঙ্গাপুর । তার পরেও মাতারবাড়ী সাগর পাড়ের মানুষের অার্তনাদে যেন অাকাশ বাতাশ ভারি হয়ে উঠছে । মাতারবাড়ীর প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে নিরব কান্নার রোল । মাতারবাড়ীতে এত উন্নয়ন তার পরও সুখে নেই এ ইউনিয়নের মানুষ গুলো , এবারের ঈদে কয়েক’শ পরিবারের ঈদ অানন্দ কেটেছে পানির সাথে যুন্ধ করে । জোয়ারের পানি অার বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে তলিয়ে গেছে মাতারবাড়ীর দক্ষিণ রাজঘাট , বিল পাড়া , উত্তর সিকদার পাড়া , দক্ষিণ সাইরার ডেইল সহ অনেক নিম্নাঞ্চল । এদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়টি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় ও দূর্যোগের তোপের মূখে থাকে প্রতিনিয়ত । বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে মাতারবাড়ী মানুষ গুলো সব চাইতে বেশি ক্ষতি গ্রস্ত হয়ে থাকে । স্থায়ীভাবে ব্ল-ক দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার না করার কারণে বার বার ক্ষতির সম্মুখীন হয় উপকূলের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন । ক্ষতিগ্রস্ত মাতারবাড়ীবাসীর বেড়িবাঁধ সংস্কারের দাবী দীর্ঘদিনের হলেও নানা অজুহাত দেখিয়ে কাজের কোন প্রকার অগ্রগতি হয়নি এখনো । ফলে অতীতেও উপকূলের লাখো মানুষ অকালেই প্রাণ হারায় সর্বনাশা বঙ্গোপসাগারে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় অার সাগরের বড় জলরাশিতে ।
বেঁড়িবাধের পাশে বসবাসকারী লোকজন জানান, গেল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে ছিল মাতারবাড়ীতে তা এখনো পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারে নি অনেক অসহায় পরিবার । ঘুমানোর জন্য ছিলনা কোনো নিরাপদ বাসস্থান । কিন্তু তার পরও এ নিয়ে খুব বেশি আক্ষেপ নেই তাঁদের । সবার আগে স্থায়ী বেড়িবাঁধ চান তারা । অপরদিকে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের ষাইটপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধের প্রায় আধাঁ কিলোমিটার এলাকা নতুন করে সাগরের বড় বড় ঢেউয়ের থাবায় বিলিন হতে চলেছে । পাকা বেড়িবাঁধের বড় অংশ ধসে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে মাতারবাড়ীর প্রায় ৯০ হাজার মানুষের । বেড়িবাঁধের বাকি এক কিলোমিটার অংশও যেকোনো সময় বিলিন হতে পারে বলে আশঙ্কা মাতারবাড়ীবাসির । তেমনটা হলে পুরো মাতারবাড়ী ইউনিয়ন সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে । চলতি বর্ষা মৌসুমে উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের অনেক নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে অার সামনের ভারি বর্ষণে পুরো মাতারবাড়ীই পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন স্থানীয় লোকজন । অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান , মাতারবাড়ীতে জলাবদ্ধতার জন্য সাগরের পানির প্রয়োজন হবে না , বৃষ্টির পানি বের হতে না পারলে এমনিতেই পুরো মাতারবাড়ী পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার অাশংকা স্থানীয় সচেতন মহলের । মাতারবাড়ীর লোকজন বার-বার পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবী জানিয়ে অাসলেও কোল পাওয়ার জেনারেশন কর্তৃপক্ষ এতে কোন ধরনের কর্ণপাত না করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানালেন ভুক্তভোগীরা । স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ মাতারবাড়ীর চতুর্থ পাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাদিক বার আবেদন করলেও এখনো কোন ধরনের উদ্যোগ গ্রহন করে নি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন । শুধু তাই নয় মাতারবাড়ীতে বাস্তবায়নাধীন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের কোন দাবীই এখনো পর্যন্ত পুরন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা । এ ছাড়াও কোল পাওয়ার জেনারেশন মাতারবাড়ী ইউনিয়নে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে পুরো ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে এমন অভিযোগও রয়েছে অহরহ । এরই মধ্যে দুইটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণের ফলে অাগে যে সমস্ত পানি চলাচলের জন্য পলবোট ও স্লুুইচগেইট ছিল তা সম্পুর্ন বন্ধ করে দিয়েছে প্রকল্পে বেড়িবাঁধ নির্মাণকারী কর্মকর্তারা । এটিই এখন মাতারবাড়ী বাসির জন্য বিষ পোড়া হয়ে নতুন করে আতংকের বিষয়ে দাড়িয়েছে । যার ফলে স্থানীয় লোকজন এখন ধীরে-ধীরে ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে । যা এক দিন বড় ধরনের বিষ্ফোরিত হয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে রুপনিতে পারে এমন অাশংকাও রয়েছে অত্র এলাকার সচেতন মহলের । এ বিষয়টি অবহিত করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, কোল পাওয়ার জেনারেশন ও মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে আবেদন করেছেন মাতারবাড়ীর ইউপি চেয়ারম্যান মাষ্টার মোহাম্মদ উল্লাহ । তিনি বলেন অবিলম্বে মাতারবাড়ীতে পানি নিষ্কাশনের জন্য কোল পাওয়ার জেনারেশন কর্তৃক একটি স্লুুইচগেট নির্মাণের বরাদ্দ দিলেও তা এ বর্ষায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না । তাই অাপাতত পলবোটের মত ব্যবস্থা করে চলতি বর্ষার পানি বের করা হচ্ছে । অাগামী গ্রীষ্ম মৌসুমে উক্ত স্লুুইচগেট নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি ।
মাতারবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিক ২টি বড় কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে জাপানের নির্মাণ সংস্থা জাইকা ও সিঙ্গাপুরের অর্থায়নে । ইতোপূর্বে মাতারবাড়ীর প্রায় ৯০ হাজার জনগন তাদের ন্যায্য কিছু দাবী নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে বহুবার উপস্থাপন করার পরও নুন্যতম দাবীও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি । গেল বর্ষার পানিতে মাতারবাড়ীর নিচু এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল । লবণ পানি প্রবেশের সুযোগ না থাকায় দুই প্রকল্পের বাইরে প্রায় হাজারো অধিক একর লবণ মাঠে চাষ করতে পারেনি চাষিরা ।
একই ভাবে চলতি বর্ষা মৌসুমে পানি বের হতে না পারলে জলাবদ্ধতার কারনে বর্ষায়ও হবে না ধান চাষ । তাই এই মুহুর্তে ব্যবস্থা না নিলে চলতি বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে বড় ধরণের বন্যার মত হয়ে দীর্ঘ দিন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে হবে মাতারবাড়ীবাসির ।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সদস্য মাষ্টার রুহুল অামিন বলেন , মাতারবাড়ীর পশ্চিম পাশের বেড়িবাঁধের যে করুন অবস্থা তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না , যেকোন মুহুর্তে সাগরে বিলিন হতে সময় লাগবে না, তার মধ্যে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অারেক কষ্ট কর হয়ে দাড়িয়েছে মাতারবাড়ীবাসি । তিনি রাঙ্গা খালীতে যে স্লুুইচগেট নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা শীঘ্রই শুরু করার জন্য কোল-পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানীর কর্মকর্তাদের অাহবান জানান । কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড এর প্রকৌশলী মোঃ শফিকুর রহমান বলেন , অামি এবছর মাতারবাড়ী বেড়িবাঁধটি পরিদর্শন করে এসেছি , মাতারবাড়ী পশ্চিমের সাইড পাড়া বেড়িবাঁধটি অার সি সি ব্লক দিয়ে একটি টেঁকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা অামাদের রয়েছে । তবে এটি অনুমোদনের জন্য ৫ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে , তাই এ বৎছর কোন রকম টিকিয়ে রাখতে অামরা সর্বাত্বক চেষ্টা করব ।

Top