বাজেট প্রতিক্রিয়া ২০১৮-১৯;প্রস্তাবিত তামাক কর: জনস্বাস্থ্য নয়,তামাক ব্যবসা সুরক্ষা পাবে

Picture.jpg

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি :

আজ ২৩ জুন ২০১৮, শনিবার, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স -আত্মা’র উদ্যোগে তামাকবিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, এসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি), ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল একশন (ইপসা), ন্যাশনাল এন্টি টোব্যাকো প্লাটফর্ম এবং তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) সম্মিলিতভাবে তামাক কর বিষয়ক বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, চেয়ারম্যান, পিকেএসএফ ও চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল এন্টি টোব্যাকো প্লাটফর্ম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রুমানা হক, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক সভাপতিত্ব করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এটিএন বাংলার প্রধান প্রতিবেদক ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স- আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন মর্তুজা হায়দার লিটন, চিফ ক্রাইম করেসপন্ডেন্ট, বিডিনিউজ২৪.কম এবং কনভেনর, ডা. মাহফুজুর রহমান ভুঁঞা, গ্রান্টস ম্যানেজার, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিড্স (সিটিএফকে) এবং অধ্যাপক ড. সোহেল রেজা চৌধুরী, বিভাগীয় প্রধান, এপিডেমিওলজি এন্ড রিসার্চ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে দেয়া বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে নিম্নস্তরের সস্তা সিগারেটের ভোক্তাই সবচেয়ে বেশি। তাই চ‚ড়ান্ত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি দশ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৩৫ টাকা করার দাবি জানাচ্ছি।’ এছাড়া তিনি প্রক্রিয়াজাতপূর্বক তামাক পণ্যের ওপর রপ্তানি শুল্ক পুনর্বহাল করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ড. রুমানা হক বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর বহাল রাখা হয়েছে। এতে করে ভোক্তার স্তর পরিবর্তনের সুযোগ অব্যাহত থাকবে যা তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।’ অন্যদিকে তামাকপণ্য রপ্তানি উৎসাহিত করাকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক বলেন, ‘আমাদের দেশে তামাক উৎপাদন করে অন্য দেশের জনগণকে সস্তায় তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করা অনৈতিক। আমরা কেবল তামাকমুক্ত বাংলাদেশই নয়, বরং তামাকমুক্ত বিশ্ব গড়তে চাই।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তামাকবিরোধীদের পক্ষ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বহুস্তরভিত্তিক করকাঠামোর পরিবর্তে সিগারেটের ক্ষেত্রে দুইটি মূল্যস্তর প্রচলন এবং সম্পূরক শুল্কের একটি অংশ সুনির্দিষ্ট কর (স্পেসিফিক ট্যাক্স) আকারে আরোপ করার দাবি করা হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন নেই। বরং সিগারেটের মূল্যস্তরকে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চস্তর হিসেবে বিভক্ত করে অতি উচ্চস্তরের সিগারেটের মূল্য ও করহার (দশ শলাকা ১০১ টাকা) তৃতীয় অর্থবছরের মতো অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর মৃত্যুবিপণন ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। নিম্নস্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনিম্ন মূল্য ৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সম্পূরক শুল্ক মাত্র ৩ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এই স্তরের সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি পাবে মাত্র ১৮.৫২ শতাংশ। বিড়ি কারখানার মালিকদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে প্রস্তাবিত বাজেটে বহুল প্রচলিত ফিল্টারবিহীন বিড়ির ২৫ শলাকার মূল্য ১২.৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যদিও মাননীয় অর্থমন্ত্রী ২০৩০ সালের মধ্যে বিড়ির উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন, তবে এই ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো দিকনির্দেশনা প্রদান না করায় এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গত তিন বছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় (নমিন্যাল) বেড়েছে ২৪.৬৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে সিগারেট ও বিড়ির দাম অপরিবর্তিত থাকায় কিংবা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ধূমপানের হার হ্রাস পাবেনা এবং একই সাথে তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতে খুব সামান্যই নিরুৎসাহিত হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকপণ্যের রপ্তানি উৎসাহিত করার অজুহাতে প্রক্রিয়াজাত তামাকপণ্যের উপর আরোপিত ২৫% রপ্তানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং চরম জনস্বাস্থ্যবিরোধী পদক্ষেপ। তামাকের আর্থ-সামাজিক ক্ষতি স্বীকার করেও এধরনের দ্বৈতনীতি গ্রহণ শুধুমাত্র তামাক কোম্পানির প্ররোচণাতেই সম্ভব হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশে তামাক ও তামাকজাত পণ্যের উৎপাদনকেই মূলত উৎসাহিত করা হবে যা, ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দা এবং গুলের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৬৫% নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসাথে ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে করারোপের ক্ষেত্রে প্রচলিত এক্স-ফ্যাক্টরি প্রাইস বাতিল করে বিড়ি-সিগারেটের ন্যায় খুচরা মূল্যের উপর করারোপ প্রথা চালু করায় জর্দা ও গুল থেকে কর আদায়ের জটিলতা কমবে। বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষতঃ নারীদের মাঝে এই পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জর্দা-গুল ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই প্রয়াস নি:সন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

সংবাদ সম্মেলনে ২০১৮-১৯ সালের চূড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরা হয়:

১. সিগারেটের প্রস্তাবিত চারটি মূল্যস্তরকে দুইটিতে নিয়ে আসা (নিম্ন ও মধ্যমস্তরকে একত্রিত করে নিম্নস্তর এবং উচ্চ ও অতি উচ্চস্তরকে একত্রিত করে উচ্চস্তর); নিম্নস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনিম্ন মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা এবং উচ্চস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করে ৬৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; এবং সকল ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটে ৫ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা।

২. বিড়ির ক্ষেত্রে ফিল্টার এবং নন-ফিল্টার বিভাজন বিলুপ্ত করা; প্রতি ২৫ শলাকা বিড়ির সর্বনিম্ন মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক এবং ৬ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা।

৩. প্রতি ১০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের উপর প্রস্তাবিত ৬৫% সম্পূরক শুল্কের পরিবর্তে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক এবং ১০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা।

৪. সকল প্রক্রিয়াজাত এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাক ও তামাকজাত পণ্য রপ্তানির উপর পুনরায় ২৫% শুল্ক আরোপ করা এবং তামাকচাষ নিরুৎসাহিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে ১০% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা।

Top