“ত্রাণ নিয়ে বাঁচতে চাই না। দ্রুত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা চাই”–ক্ষুব্ধ চেয়ারম্যান ও ধলঘাটবাসী

IMG_20180621_015812.jpg

জে.জাহেদ,ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম:

চতুর্দিকে সমুদ্রের লোনাজলে বেষ্টিত মহেশখালীর ধলঘাটা গ্রাম। অরক্ষিত ভেড়ীবাঁধে শেষ ভরসায়ও এখন তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে।

ফলে ইউনিয়নের পন্ডিতের ডেইল, সাপমারারডেইল, বেগুনবনিয়া শরইতলা, উত্তর সুতরিয়া, বনজামিরা ঘোনা, নাছির মোহাম্মদ ডেইলসহ বলতে গেলে গ্রামটি এখন পানির নিচে ডুবন্ত। এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন যাবত ক্ষতিগ্রস্ত বেড়ীবাঁধ মেরামতে সরকার কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দিলেও কার্যকরী কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে চেয়ারম্যান ও ধলঘাটাবাসী।

সরেজমিন জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) ৭০ নং পোল্ডারের অধীনে থাকা ধলঘাটার বিভিন্ন স্থানে ভেড়ীবাঁধের অর্ধেকেরও বেশী অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

নতুন করে আরও ফাঁটল সৃষ্টি হওয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানির তোড়ে ভেড়ীবাঁধ ভেঙে যাবে এমন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। এসব ঝুঁকিপুর্ণ জায়গায় কাজ করতে সরকার তড়িত গতিতে বরাদ্দ দিয়েছিলো। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কাজ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরব ভুমিকা হতাশ করেছে এলাকাবাসীকে।

ধলঘাটা গ্রাম মূলত বঙ্গোপসাগরের সাথে সংযুক্ত। গ্রাম রক্ষা বাধেঁর একাধিক পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে গিয়ে পাশর্^বর্তী এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ পানির নিচে। ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, লবনের গর্ত, ফসলি জমি ডুবে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে এলাকার মানুষ।

কয়েকটি ঠিকাদারের অবহেলায় ভেড়ীবাঁধের অবস্থা এমন সংকটাপন্ন বলে জানা যায়। বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর অধীনে প্রায় ৭০ কোটি টাকার কাজ চলছে কাগজে দেখা যায়। শুধুমাত্র কিছু ব্লক পাথর তৈরী করলেও মূল বাঁধের কাজে নেই কোন অগ্রগতি। চেয়ারম্যান কামরুল হাসানও এলাকাবাসী হাজার অনুরোধ করেও বাঁধের কাজ শুরু করাতে পারিনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে পুর্বের তৈরী খসে যাওয়া বেড়ীবাঁধও ভেঙে এখন পন্ডিতের ডেইল, বেগুনবনিয়াসহ এলাকার পাঁচ শত পরিবার প্লাবিত।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, আরসিসি ব্লক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রক্ষার উদ্দেশ্যে গত অর্থবছরে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার বরাদ্দ হয়। আর এসব ঠিকাদারী কাজের দায়িত্ব পান চেয়ারম্যান মানিক ঠিকাদার, সি আইপি আতিকুল ইসলাম।

কিন্তু এসব ঠিকাদার দায়সারা ভাবে কাজ করতে থাকেন আবার কেউ কাজই শুরু করেন নি। ফলে সরকার ও জনগণের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ জলে ভাসছে। কিছু ঠিকাদার কৌশলে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পেয়ে উল্টো সময় বাড়িয়ে নিয়েছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, কিছু বস্তার মধ্যে বালু ভর্তি করে ভেড়ীবাঁধের উপর রেখে দিয়েছে। সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় দেয়ার ব্যাপারেও কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পন্ডিতের ডেইল গ্রামের বারেক মিয়া(৫৫), উত্তর সুতরিয়া গ্রামের কলিম উল্লাহ (৩০), বনজামিরা ঘোনা গ্রামের মাস্টার আমিনুল হক (৫৭), বেগুনবনিয়া গ্রামের শেখ জিয়াবুল(২৭), শরইতলা গ্রামের মোক্তার আহম (৪৮) ও মোহাম্মদ ডেইলের আরও কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন যাবত ধলঘাটা ইউনিয়নের ভেড়ীবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক ও খারাপ।

তাঁরা জানান, বেড়িবাঁধ ভাঙতে ভাঙতে চিকন হয়ে গেলেও ঠিকাদারের কোন দেখা থাকেনা। যে কোন মুহূর্তে বেড়িবাঁধ একেবারে ভেঙে যেতে পারে । এমন আশঙ্কায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারেনা জনগণ।

স্থানীয় যুবক ফরিদুল আলম (৩৫) বলেন, বিগত অমাবস্যা জোয়ারের সময়ও বেড়িবাঁধ উপচে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। মনে হয়েছিল এবার আর গ্রাম রক্ষা পাবেনা। ওয়াপদার লোকজনের কোনো মাথা ব্যথা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফোরকান আহমদ (৪৯) বলেন, বাঁধের অবস্থা খুব খারাপ। কন্ট্রাক্টর বেড়িবাঁধ এ মাটি ফেলবে বলে কথা দিলেও অনেকদিন তাদের কাজের অগ্রগতির কোন ছোঁয়া লাগেনি। এদিকে বর্ষাকালে বড় জোয়ার হলে কোনভাবেই রক্ষা পাওয়া যাবে না জানান।

এমন শঙ্কায় পরিবার পরিজন নিয়ে পুরা গ্রামে বসবাস করে যাচ্ছেন ২৫হাজারেরও অধিক মানুষ। দিনে কোন রকমে সময় পার করলেও রাত্রিটা মহিলাদের কাছে বেশ ভয়ের বলে জানান। কেননা যেকোন সময় গ্রাম তলিয়ে যেতে পারে এমন আশংকা বিরাজ করছে।

একই গ্রামের কাইসার হামিদ (৪৯) বলেন, ভেঙে গেলে হয়তো এমপি বা সরকারের লোকেরা ত্রাণ নিয়ে হাজির হবেন। কিন্তু আমরা পানির মধ্যে ঘরবাড়ি, জমি জায়গা ডুবে যাওয়ার পর ত্রাণ নিয়ে বাঁচতে চাই না। দ্রুত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা চাই।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাউবো প্রধান প্রকৌশলী সবিবুর রহমান এর ০১৯১৭-০৪৩০৫৭ নাম্বারে কয়েকবার ফোন ও সাংবাদিক পরিচয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে নাম প্রকাশ না করা পাউবোর এক র্কমর্কতা জানান, ধলঘাটা বেড়ীবাঁধের অবস্থা সংকটাপন্ন রয়েছে স্বীকার করে জানান, বাঁধ মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ তৈরী ও সংস্কারের জন্য কাজ করছেন। আপাতত ভাঙন কবলিত স্থানে বালুর বস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া আরও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

জানতে চাইলে নিয়োগকৃত কাজ তাদারকী করার দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার সাজিদ জানান, আমরা ইতিমধ্যে ব্লক তৈরীর কাজ শেষ করেছি ,বর্ষার পরে বাকি কাজ শুরু করব । চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ ভাবে কাজ করছি। দায়সারা কাজ কিংবা গাফিলতির বিষয় তিনি অস্বীকার করেন।

ঠিকাদার এবং পাউবো কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে ধলঘাটা আবারো জোয়ার ভাঁটায় ভাসছে। তা দেখে এলাকাবাসীর সাথে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল হাসানও বেশ ক্ষুব্ধ বলে জানা যায়। যদিও শুরু থেকে এলাকার মানুষের কষ্ট দেখে জনপ্রতিনিধি হিসাবে কাজ আদায়সহ বিভিন্ন বরাদ্দ পেতে জোর তদবির করেছিলেন তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম জিও ব্যাগ দিয়ে প্রায় ৫কোটি টাকার কাজ এখনো শুরু না করায়, শরইতলা, উত্তর সুতরিয়া, বনজামিরা ঘোনা, নাছির মোহাম্মদডেইল ৪ টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার পরিবার আজ প্লাবিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, তার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ধলঘাটায় কোন কাজ করছেনা বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে ঠিকাদার আনিসুল ইসলাম বলেন,টেম্পারারি ভাবে তারা চেষ্টা করছেন বাধঁ টিকিয়ে রাখতে।
স্থানীয় চেয়ারম্যান কামরুল হাসান এবিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিভাগের সহযোগিতা চেয়েছেন।

Top