জৈন্তাপুরের নীল নদ,লালাখাল,সারি সারি পাহাড় আর চোখ জুড়ানো চা বাগান

P_20171201_121657.jpg

Jpeg

মোঃ এম,এম,রুহেল জৈন্তাপুর সিলেট।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং ছোট ছোট পাহাড়, টিলা, অরণ্য বেষ্টিত সিলেট স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত। সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, সারি নদীর অপরুপ সৌন্দর্য সিলেটকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আলাদাভাবে পরিচিতি দিয়েছে। সেই পরিচিতির অন্যতম অলংকার সারি নদি হয়ে পৌঁছা লালাখাল। সারি নদীর স্বচ্ছ জলরাশির উপর দিয়ে নৌকা অথবা স্পিডডবোটে করে আপনি যেতে পারেন লালাখালে।নৌকা ভাড়া ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা, স্পিড বোটে ২৫০০/৩০০০ হাজার টাকা। ৪৫ মিনিট যাত্রা শেষে আপনি পৌঁছে যাবেন লালাখাল চা বাগানের ফ্যাক্টরি ঘাটে।

মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন নদীর পানির দিকে। কি সুন্দর নীল, স্বচ্ছ পানির মধ্যে দেখা যায় পানির নিচের আবরণ দেখা যায়। ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই লালাখালের অবস্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান এবং সাতের সৌন্দর্যে ভরপুর এই লালাখাল সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার সন্নিকটে অবস্থিত।

চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত। প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের এক অপরুপ নিদর্শন লীলাভূমি লালাখাল। নদী আর পাহাড়ের মেলবন্ধন। নদীর টলটলে স্রোতস্বীনি পানি আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণাধারা, এ যেন প্রকৃতির এক মায়াময়ী রুপ সৌন্দর্য। নদির পানিতে নৌকার উপর বসে পাহাড় দেখার সৌন্দর্যই আলাদা। ছোট এ নদীর পানি নজরকাড়া। না দেখলে বুঝানো যাবে না সৌন্দের্যের সেই অপরুপ বাহার।

বাংলাদেশের এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে রয়েছে নদী এবং পাহাড়ের মিলন মেলা। দু’চোখ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন কিন্তু সৌন্দর্য শেষ হবে না লালাখালের। লালা খালকে নদী বললে ভুল হবে না। কেননা পিয়াইন নদীকে যদি নদী বলা যায় তবে লালাখালকেও নদী বলা বাঞ্ছনীয়।

কবির সেই কবিতার মতো – আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। তবে বৈশাখে লালাখালে হাঁটু পানি থাকেনা বলে জানালেন স্থানীয়রা। ভরা বর্ষায় পানি যখন দু’কূল ছাপিয়ে উঠে তখন এই উর্বশীর খালের রুপই অন্যরকম। সারিঘাট থেকে প্রতি ঘন্টায় নৌকা ছেড়ে যায়। স্থানীয়রা নৌকায় যাতায়াত করেন।

খালের যেখানেই শুরু সেখানেই চা বাগান। এর পরই ভারতের সীমান্ত। খালের অপরূপ রূপকে উপভোগ করতে হলে নৌকায় ভ্রমণের কোন বিকল্প নেই। দল বেধেঁ সেখানে গেলে সুবিধা বেশি কারণ নৌকার ভাড়া বেশি নয়। জন প্রতি ১০ টাকা, ভ্রমণে আনন্দও উপভোগ করা যায় এবং সকলে মিলে হৈ-চৈ করে আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়।

লালাখালকে কেন লালাখাল বলা হয় জানা যায়নি। নৌকার মাঝির কাছ থেকেও এর কোন ব্যখ্যা উদ্ধার করা যায়নি। নদীর পানির রং নীল । পানি স্থির নয়ঁ, সব সময় চলমান। কেননা পাহাড় থেকে সবসময় পানি গড়িয়ে পড়ছে। নদীতে স্রোত থাকায় যাওয়ার পথে সময় বেশি লাগে আসার পথে কম। নদীর পানি নীল কেন বোঝা মুশকিল। পানি ঘোলা হয়ে যে নীল হয়েছে তাও কিন্তু নয়। এরপরও এ নদীর পানি নীল। তাই নদীর পানি নিয়ে যে মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। এ নদীর পানি নীল কিন্তু নাম কেন লালাখাল হল- এমন প্রশ্ন অনেক পর্যটকের। হতে পারে নীলা খাল। মিশরের নীল নদ দেখা হয়নি। তবে এ খাল দেখে মনে হয়, নীলাভ পানির লালাখাল যেন সিলেটের নীল নদ। লালাখালের দুই পাড়ে তেমন কোন বাড়ি-ঘর নেই।

কিন্তু আছে অনেক রকমের গাছপালার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যেন চারপাশে সবুজের হাতছানি। মাঝেঁ মাঁঝে কাঁশবনের ঝোপ চোখে পড়ে। তবে নদীতে অসংখ্য বাঁকের দেখা মেলে। প্রতিটি বাঁকই দেখার মত সুন্দর। নদী থেকে দূরে পাহাড় দেখা যায়। দেখলে যতটা কাছে মনে হয় আসতে তত কাছে না। পাহাড়গুলোকে দেখলে মনে হয় কেউ যেন নিজ হাতে থরে থরে একের পর একটি করে সাজিয়ে রেখেছে। এখানে পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমা হয়।

একটু কাছ থেকে দেখা যায় মেঘেরা দল বেধেঁ পাহাড়ের গায়ে ঠেস লাগিয়ে থেমে থাকে। আবার কখনো দুই পাহাড়ের মাঝ খান দিয়ে সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে যায়। কখনো মেঘ বেশি জমা হলে এখানে বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে দু-একটি ঘাটে একাধিক পল্লী বধূকে দেখা যায়। কাঁখে কলসীতে করে পানি নিয়ে যাচ্ছে। কেউ বা গোসল করতে নদীতে নেমে নীল জলে গা জুড়াচ্ছে। গ্রামীণ আবহ বিদ্যমান। নদীতে আসা গায়ের বধূদের দেখলে মনে হয় তারা বেশ দূর থেকেই এসেছে।

রান্না এবং খাবারের পানি তারা এ খাল থেকেই সংগ্রহ করে। দল বেধেঁ আসে। আর একাধিক পাত্রে পানি নিয়ে আবার দল বেঁধে বাড়ি ফিরে। ভ্রমন বিলাসী পর্যটকদের জন্য এই স্থানটি একটি আকষণীয় স্পট হতে পারে। যদিও বর্তমানে এখানে জাতীয় কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। লালাখাল এলাকায় পর্যটকদের থাকার কোন জায়গা নেই। আর সিলেট শহর থেকে বেশ দূরে। সন্ধ্যার দিকে নদীতে কোন নৌকা থাকে না, তাই ভ্রমন বা ঘোরাঘোরি সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ করতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় নৌকা নিয়ে যাতায়াত করলে। লালাখালের চারপাশে সন্ধ্যার আগ মুহূর্তটা আরো অবিস্মরণীয়।

উপরে আলোকিত আকাশ। ক্লান্ত সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে। চারপাশে গাছপালার মাঝে পাখির কিচিরমিচির। এসব দেখলে মনে হয় পাহাড় থেকে তির তির সন্ধ্যা নেমে আসছে। ধীরে ধীরে গোধুলীকেও আধাঁর ঢেকে দেয়। ক্রমে চারপাশে নেমে আশে আঁধার। সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসে লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলে।

লালাখালের সূর্য ডুবির দৃশ্য অপরুপ।

উপরে স্বচ্ছ আকাশ, চারিদিকে মায়াবি এক আঁধার তার সাথে আছে পানির কলকল শব্দ, সন্ধ্যার সময় লালাখালে বেশ ভালো লাগার মতো। জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্হিত সেটা দেখে পথে আআর পাবেন কমলা বাগান, জৈন্তা রাজবাড়ী,লাল শাপলার বিল,লালাখালে যেতে হলে, সিলেট নগরীর ধোপাদিধীর দক্ষিণপারস্থ ওসমানী শিশু উদ্যানের (শিুশু পার্ক) সামনে থেকে টেম্পু, লেগুনা অথবা জাফলংয়ের বাসে যেতে হবে সারিঘাট। তাই পাড়ি দিতে হবে ৩৫ কি.মি. রাস্তা তার পরেই ফিরে পাওয়া যাবে প্রাকৃতির অপরুপ স্বপ্নের লালাখাল যা অনেকের কাছে মিশরের নীল নদ নামে পরিচিত।

Top