ব্যবসা বাণিজ্য ন্যায়সঙ্গত মুনাফার জন্য; মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য নয়

IMG_20180612_131458.jpg

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

মানুষের এই পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা এবং জীবন ধারণের জন্যে পাঁচটি অপরিহার্য মৌলিক চাহিদা রয়েছে। আর এই চাহিদাগুলো হল খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা। এসব মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য কৃষক জমিতে চাষাবাদ করছে। উৎপাদন করছে শাক সবজী, তরিতরকারি, ফলমূল, চাল ডাল সহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, জেলেরা সাগর,নদী পুকুর জলাশয় থেকে মাছ শিকার করছে, মৎস্য জীবীরা মাছ চাষ করে দেশের মৎস্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। দেশে উৎপাদিত হচ্ছে হরেক রকমের বস্ত্র। বাহারি রং আর ডিজাইনের পোষাক পরিচ্ছদ। ঘর বাড়ী তৈরি করার জন্য বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী দেশে উৎপাদিত বা নির্মাণ করা হচ্ছে, কারিগর বা নির্মাণ শ্রমিকেরা তৈরি করছে বাসস্থান। প্রয়োজনীয় অনেক নির্মাণ সামগ্রীও প্রয়োজনে আনা হচ্ছে বিদেশ থেকে। শিক্ষা উপকরণ কাগজ কলম সহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ তৈরি হচ্ছে বা বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য ঔষধ উৎপাদিত এবং অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক জীবন রক্ষাকারী ঔষধ বা সরঞ্জাম আনা হচ্ছে বিদেশ থেকে। বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদার পূরণের জন্য নানান ধরণের ব্যবসা পরিচালিত করছে ব্যবসায়ীরাই। মানুষের চাহিদার সব প্রয়োজনীয় দ্রব্য বা সেবা সামগ্রী আমাদের দেশ স্বয়ংসম্পন্ন নয়। তাই যেসব পণ্যের ঘাটতি থাকে তা আমদানি করা হয়। আমদানি করা হয় যেসব পণ্য সামগ্রী আমাদের দেশে উৎপন্ন বা তৈরি হয়না এমন প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র। আবার অনেক পণ্য সামগ্রী আছে যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে তা বিদেশে রফতানি করা হয়। আবার দেশের উৎপাদিত অনেক পণ্যের ঘাটতি মোকাবেলার জন্য আমদানীও করতে হয়। সত্যিকার অর্থে ব্যবহার কারী বা ভোক্তাদের তাঁদের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য কেনার জন্য উৎপাদক বা বিক্রেতা বা ব্যবসায়ীদের দ্বারস্ত হতে হচ্ছে প্রতি নিয়ত। সেবা নিতেও যেতে হচ্ছে সেই ব্যবসায়ীদের কাছেই। আমরা ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভরশীল আমাদের বেঁচে থাকার সব উপকরণ বা সেবার জন্য।

ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন এর জন্য তাঁদের উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি, রপ্তানি, বিতরণ ইত্যাদিতে যে খরচ হয় তা মেটানোর পর একটা ন্যায্য যৌক্তিক লাভ করবেন এটাই স্বাভাবিক বিষয়। সততার সঙ্গে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করবে তাদের সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, নীতিবান ও সৎ ব্যবসায়ীরা কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। আবার যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করবে তাদের সম্পর্কে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি এসেছে। রসুল (সা.) বলেছেন, যে ধোঁকা দেবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদদের মতে, ইসলামী পরিভাষায় মজুদদারি হচ্ছে, খাদ্যশস্য মজুদ করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা। অত:পর মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা বিক্রি করে প্রচুর পরিমাণে লাভবান হওয়া। ইসলামে ব্যবসাকে হালাল করেছে, সুদকে করেছে হারাম। এবং সতর্ক করা হয়েছে ওজনে যেন কম দেয়া না হয় সেব্যাপারেও। মহানবী (স:) ব্যবসা পছন্দ করতেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে আমরা ব্যবসাকে রুটি রুজির জন্য ন্যায় সংগত জীবিকা নির্বাহের জন্য সততা, ন্যায় নিষ্ঠা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ধর্মীয় রীতি নীতি বা অনুশাসন মেনে যুক্তিযুক্ত, ন্যায্য দামে বিক্রি করে মুনাফা করার মন মানসিকতা অনেকেরই কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় বা সেই মন মানসিকতাও নেই। অনেকেই অতি দ্রুত বেশী মুনাফা বা লাভ করতে চাইয়। তাই অনেকেই খাদ্যে ভেজাল দেয়, বিষাক্ত এবং মানুষের দেহের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যে ব্যবহার করে। নকল পণ্য সামগ্রী বাজারজাত করে। সততা, ন্যায়নীতি, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, ধর্মীয় নীতিবোধ, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা সবকিছু এখন অনেকের কাছে যেন সেকেলে পুরানো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। পরকালের চিন্তা যেন পরকালের জন্যেই তোলা থাকে। নামাজ পড়তে পড়তে মাথায়, পায়ে, হাটুতে জট পড়ে গেছে, কতবার হজ্জ করেছেন মনে নেই কিন্তু মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, মজুদদারী করে মানুষকে কষ্ট দেয়, মানুষের জীবন ধারণ কষ্টসাধ্য ও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে লোভী মনোভাবের কারণে, অন্যায়ভাবে বা অবৈধ উপায়ে আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য, নিজেদেরকে সম্পদশালী করার জন্য।

মুসলমানদের পবিত্র এবং পূণ্য হাসিলের সিয়াম সাধনার, রহমত, মাগফেরাত এবং নাজাতের রমজান প্রায় শেষের দিকে। পবিত্র আল কোরআন নাজিল এবং সংযমের মাস এই রমজান। অত্যন্ত দুঃখের সাথে দেশবাসী দেখলো কোন যুক্তিসংগত বা ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যের মূল্য হু হু করে বেড়েছে। মজুদ, সরবরাহ, যোগান, বিতরণ সবকিছু ঠিকটাক থাকার পরেও মূল্যবৃদ্ধি কেন ঘটে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বোধগম্য নয় প্রতিবছর রমজান মাসে কেন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। এই পবিত্র রমজান মাসে ব্যবসায়ীরা যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, মানুষের পোষাক পরিচ্ছদ সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী মানুষের নাগালের মধ্যে রেখে পূণ্য হাছিলের চেষ্টা করবে তা না করে অতিলোভী মনোভাবের কারণে তাঁরা বিভিন্ন দ্রব্য আর পণ্য সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু ব্যবসায়ীদের মজুদদারির কারণে বা বিভিন্ন সিণ্ডিকেটের কারসাজির কারণে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটে।

ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার একটি ন্যায্য, ন্যায়সঙ্গত মূল্য নির্ধারণ করবেন তাতে আমাদের কিছুই বলার নেই। তাঁদের সব ধরণের খরচ, অবচয়, ব্যাংক সুদ ও বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ, উৎপাদন খরচ, কর্মচারীদের বেতন ভাতা, ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ভ্যাট, সরকারি রাজস্ব এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে যুক্তিসংগত এবং ন্যায়সঙ্গত ভাবে করবেন এটাই জনমানুষের প্রত্যাশা। এবং এটাই সকলের কাছে কাম্য ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ব্যবসায়ীরা মানবিকতা, নৈতিকতা, সততা, সামাজিক সাম্য, অঙ্গীকারের প্রতি দায়বদ্ধ না থেকে নকল ভেজাল পণ্য এবং দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি করছেন। মানুষের বেঁচে থাকার ঔষধ পর্যন্ত নকল হচ্ছে। ওজনে ঠকানো হচ্ছে, মজুদদারি করে অতি মুনাফার জন্য চক্ষু লজ্জা উপেক্ষা করে মানুষের দুঃখ, দুর্ভোগ, দুর্গতি বাড়ানো হচ্ছে। মানুষের জীবন ধারণ অসহনীয়, দুঃখজনক এবং কষ্টকর হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা ব্যবসায়ীরাও মানুষ তাঁরা তাঁদের ব্যবসা বাণিজ্য অবশ্যই মানবিক, নৈতিক, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় রেখে একটা ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত লাভ করবেন এবং মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে ভেজাল এবং নকল সামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করবেন। অতি মুনাফার জন্য মানুষকে বিষাক্ত, ভেজাল, নকল খাদ্য খাইয়ে মেরে ফেলা বা জীবন ধারণ কষ্টকর করার অধিকার ব্যবসায়ীদের নেই। ব্যবসা বাণিজ্য ন্যায়সঙ্গত মুনাফা আর জন কল্যাণের জন্য মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য নয় এই সত্যটা ব্যবসায়ীরা উপলব্ধি করবেন এটাই সবার প্রত্যাশা।

Top