বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকান্ড মাদক নির্মূল করবে তো?

received_185194532201248.jpeg

মে.আরাফাত বিন হাসান :

পুরো বাংলাদেশে জিরো টলারেন্স রীততে মাদক ব্যাবসায়ী মুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। দেশে যে কিশোর অপরাধ সহ সকল অপরাধের সুদিন চলছে তাতে মাদক রাসয়নিক সারের মতো কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধ জগতের অধিপতি হওয়ার প্রক্রিয়াটা শুরু হয় মাদক গ্রহণের মাধ্যমে। আবার মাদক ব্যাবসা করে আঙ্গুল ফোলে কলাগাছ হওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের।এমনতাবস্থায় সরকারের এ উদ্যোগকে কর্যকর ও সময় উপযোগী বলে সাধুবাদ জানাচ্ছেন অনেকেই। মাদক ক্যান্সার কোষের ন্যায় দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা হিতাহিত জ্ঞান আছে এমন ব্যাক্তি মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য। মানব দেহে ক্যান্সার কোষের সৃষ্টি হলে বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ তা উপড়ে ফেলতে দ্বিধাবোধ করাবে না।তাই দেশকে যেহেতু মাদক নমক এক ভয়ঙ্কর ক্যান্সার কোষকলা আক্রমণ করেছে দেশকে বাঁচানোর তাগিদে তা উপড়ে ফেলতেই হবে।মানবদেহের কোনো কোষে ক্যান্সার হলে ঐসব ক্যান্সার কোষকলা কেটে পেলে দিতে হয়।আমরা তার নাম দিয়েছি সার্জারি। দেশের মানুষগুলো যদি মানবদেহের কোষের সাথে তুল্য হয় মাদক ব্যাবসায়ীদের তুলনা করা হচ্ছে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকলার সাথে। তাই তাদেরও সার্জারির মাধ্যমে তাদের উপড়ে ফেলতে হবে। আর সার্জারি করে মাদকমুক্ত করার এই গুরুদায়িত্ব পড়েছে দেশের প্রশাসনের উপর। গত কয়েকদিনে র্যবা-পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা শতাধিক। বলা যায় এটাই সার্জারি করে মাদকমুক্ত করার নমুনা। কিন্তু যে ক’জন মানুষ নিহত হয়েছে তাদের সবাই যে মাদক ব্যবসায়ী তা আমি বিশ্বাস করিনা।
কারণ আমাদের দেশের মানুষগুলো অতিশয় উদার,আন্তরিক হলেও পরশ্রীকাতরতা এবং প্রতিহিংসার ক্ষেত্রেও কোনো অংশে কম নয়। আমাদের মধ্যে অনেকে অন্যের ভালো সহ্য করতে পারেনা। সেসব মানুষ যে চক্রান্ত করে জিরো টলারেন্স নীতিতে মাদক ব্যবসায়ী পরিষ্কার করার এই সুযোগ কাজে লাগাবেনা তার কোনো নিশ্চায়তা নেই। একজন ভালো মানুষকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে কোনো অসাধু ক্ষমতাবানের ইশারায় হত্যা করতে কতক্ষণ? আর মাদক ব্যবসায়ী তকমা লাগিয়ে এরকম কোনো হত্যার ঘটনা ঘটলেও সত্য ঘটনা ভেবে সহজে কেউ নাক গলাতে চাইবেনা। আমার বিশ্বাস এই মোক্ষম সুযোগ সুযোগসন্ধানীরা হাতছাড়া করবেনা।

আবার পৃথিবীর একশ’রও বেশি দেশ সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে।প্রায় পঞ্চাশটির মতো দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। বহু আন্তর্জাতিক মানবধিকার সংগঠন বহুদিন ধরে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিৎ, কিন্তু কোনো অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিলে যে সব সমধান হয়ে যাবে এমনটা নয়। যাই হোক,এ বিষয়টা নিয়ে বিভিন্নজনের বিভিন্নমত। তাই আমি এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা করতে চাইনা। কিন্তু কিছুদিন যাবৎ মাদক ব্যবসায়ীদের যেভাবে বিচারবহির্ভূূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে তা মোটেও ভালো কিছু নয়। তাছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধও বটে। বিচারবহির্ভূত তদন্তহীন এ হত্যাযজ্ঞে যদি কোনোভাবে কোনো নিরপরাধ মানুষ নিক্ষিপ্ত হয় এর দায় কে নেবে? যাই হোক না কেন যে নিরপরাধ মানুষটি প্রাণ হারাবে তার প্রাণ আর ফিরে পাওয়া যাবেনা। আর প্রতিটি প্রাণ এতই মূলব্যান যে পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়ে একটি হারানো প্রাণ ফিরে পাওয়া যায় না। যদি একান্তই মাদক ব্যবসায়ীদের হত্যা করতে হয় সঠিক তদন্তপূর্বক আদালতের বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। তাতে কারো কথা বলার খুব একটা সুযোগ থাকেনা।আর কোনো নিরপরাধ মানুষের প্রাণ হারানোর ঝুঁকিও থাকবেনা। দুঃখের বিষয় যে মানবধিকার সংগঠনগুলো অজ্ঞাত কারনে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিরব রয়েছে।

বাংলাদেশে সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে সেনা সদস্য,পুলিশ, উপজেলা চেয়ারম্যান,ইউনিয়ন চেয়ারম্যান,ইউপি সদস্য সহ বহু সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীর মাদক ব্যবসায় জড়ানোর নজির আছে। যারা প্রকৃত অর্থে মাদক ব্যবসায়ী,মাদক ব্যবসা করে যারা রাতারাতি কোটিপতি হয়ে এখন রীতিমতো সমাজের কর্তাব্যক্তি তারা ক্ষমতাবলে সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। টেকনাফের সাইফুল নামের এক মাঝারি ধরণের মাদক ব্যবসায়ীর কথা শোনা যাক স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার মুখে। “তিনি বলেন, সাইফুলের ঘনিষ্ঠ এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে কয়েক মাস আগে আটক করা হয়েছিল। এরপর পুলিশ প্রশাসনের এমন উচ্চপর্যায় থেকে ফোন আসে, যা কল্পনাও করা যায় না। এরপর থেকেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সাইফুলকে অনেকটাই সমীহ করে চলেন। (দৈনিক যুগান্তর,২৪ শে মে ২০১৮)।” তাই এটা স্পষ্ট যে তাদের হাত এতোই লম্বা যে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তাগন প্রকৃত অর্থে দেশকে মাদকমুক্ত করতে চান,তারাও দূর থেকে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের দেখে আফসোস ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না।সবচেয়ে বড় কথা হলো ক্রসফায়ারে বিচার বহির্ভূতভাবে যে ক’জনকে হত্যা করা হয়েছে তাদের মধ্যে অনেককে মাদক সম্রাট টাইপের তকমা লাগলেও মাদক সাম্রাজ্যে প্রায় তারা সবাই চুনোপুঁটির ন্যায় খুচরো ব্যবসায়ী। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সম্প্রতি দেশের মাদক গডফাদারদের যে তালিকা প্রণয়ন করে সেখানে ১৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।এরাই মূলত মাদকের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডন হিসেবে পরিচিত। তাদের হাতেই দেশের মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।এই ১৪১ জনের মধ্যে প্রথমদিকের একজন বর্তমান সংসদ সদস্য। কিন্তু ঐ সংসদ সদস্যসহ সবাই চলমান মাদকমুক্তি অভিযানে বলি হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের অনেকের নিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা পর্যন্ত নেয়া হয় নি।তারা বরং জনসমক্ষে এসে মাদকের নিরুদ্ধে নানা রকম শ্লোগান শোনাচ্ছেন আমাদের।

পুরো মাদক ব্যবসার প্রক্রিয়াটাকে যদি একটি গাছের সাথে তুলনা করি, গাছটাকে পুরোপুরো ধ্বংস করতে হলে মূলসমেত গাছটাকে উপড়ে ফেলতে হবে। মূল এবং কান্ড আস্ত রেখে এই গাছকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়তো লোকদেখানো নয়তো নিতান্তই পাগলামো। কারণ মূল এবং কান্ড রেখে ডালগুলো ছাটাই করলে দুইদিন পরেই পার্শ্বমুকুল গজাবে।এ কয়দিনে ক্রসফায়ারে যে কয়জন খুচরো মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে আমি তাদেরকে গাছের ডালের সাথে তুলনা করবো। এদের হত্যা করলেও পার্শ্বমুকুলের ন্যায় দুদিন পরেই নতুন খুচরো মাদক ব্যবসায়ীর সৃষ্টি হবে। কারণ অপরাধীরা সবসময় অপরাধের শাস্তির কথা চিন্তা করে অপরাধ করে না। অন্যদিকে যারা ‘মাদক ব্যবসা প্রক্রিয়া’ নামক গাছটির কান্ড এবং মূল এর অবস্থান দখল করে আছে,তারা মাটি থেকে রস আস্বাদনের কাজটি ধীর সুস্থে করে যাচ্ছে।

তাই কৌতুহলী মনের প্রশ্ন, বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকান্ড মাদক নির্মূল করবে তো?

লেখক: শিক্ষার্থী

Top