আমরা চাইলে পারি অনেক অসাধ্য সাধন করতে !

unnamed-1.png
মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী ।
আমরা যেন ভুলেই গিয়েছিলাম প্রশ্নপত্র ফাঁসহীন নির্বিঘ্ন পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা। বলছি  গত ২ এপ্রিল’১৮ থেকে শুরু হওয়া এইচ এস সি পরীক্ষা পরীক্ষার কথা দেশবাসী, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের জন্য এদিনটি বড় আনন্দের কেননা   প্রশ্নপত্র ফাঁসের চিরাচরিত সেই দুঃখজনক, কলঙ্কজনকমহামারীর আকার ধারণ করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। এটা শুধু আনন্দের নয়, স্বস্থির, আস্থার আর ভরসার বিরাট ব্যাপার। প্রশ্ন ফাঁসের সেই মহামারী দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ভঙ্গুর করে তুলেছে। প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধের আন্তরিকতা এবং সততা নিয়ে। দেশের নতুন প্রজন্মকে টালমাটাল, দিশেহারা অবস্থায় ফেলে দিয়েছে প্রশ্ন পত্র ফাঁসের অনভিপ্রেত, অনাকাংখিত এবং দুঃখজনক ঘটনা। এই অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীই কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়েছে। অনেকেই নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে পরীক্ষা দিতে বসেছে, হয়েছে বিপথগামী। শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা কোনটি সৎ বা অসৎ, কোনটি বৈধ বা অবৈধ তা বিচার করার জ্ঞানটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিল। শিক্ষার্থীরা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেছে, লেখা পড়া না করে শর্টকাট পদ্ধতিতে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র যোগাড় করার এবং তা দেখে উত্তর দেয়ার হুজুগে পেয়ে গিয়েছিল অনেককেই। স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবী উঠেছে সমাজের সর্বস্তর থেকেইশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী যাঁদের অনেকের কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের হদিস পাওয়া গেছে। শিক্ষার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকদের বিপথগামী কিছু সদস্য, প্রশ্নপত্র বহনকারী জেলা উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী,  জেলা উপজেলার কিছু শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারী, পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার লোক, কোচিং সেন্টারের মালিক কর্মচারী, প্রযুক্তি জ্ঞানের অধিকারী অনেক শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং মেধাবী মানুষ, ছাত্র নেতাসহ অনেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে আর মহা কর্মযজ্ঞের সাথে জড়িত ছিল। যা জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, দুঃখজনক, নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজ।

বেশ কয়েক বছর থেকে প্রশ্ন ফাঁসের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ক্রমশ বিস্তার লাভ করেছে। নিয়োগ পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা, এস এস সি, এইচ এস সি, জে এস সি সহ অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকার ধারণ করেছে মহামারী রোগের মতো। পচন ধরতে বসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার ও পরীক্ষা পদ্ধতির। সরকারের নানান মুখী সব চেষ্টা আর প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর মন্ত্রীর সততা, নৈতিকতা নিয়ে। সরকারের প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর প্রয়াস, ইচ্ছা, আন্তরিকতা, কৌশল সবকিছুর ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছিল বার বার। পরীক্ষা গ্রহণ যেন একটা নিছক আনুষ্ঠানিকতায়, একটা রং তামাসায়, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের বিষয়ে পরিণত হয়েছে এতে  সরকার নানানভাবে সমালোচিত, নিন্দিত হয়েছে এবং সরকারের অনেক সাফল্য বা অর্জন যে ম্লান হয়েছে তা অনস্বীকার্য।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রতিভা, সৃষ্টিশীলতা, মননশীলতার, সুকুমার বৃত্তির প্রকাশ বিকাশ ঘটানোর জন্য তাদেরকে শিক্ষা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নিয়মনীতি, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা, বাঙ্গালীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিবেশের মাধ্যমে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেয় স্কুল কলেজ  বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আর এই  শিক্ষা গ্রহণ, অনুশীলন আর  চর্চার মূল্যায়নের মূল পদ্ধতিই হল পরীক্ষা। কিন্তু সেই পরীক্ষা সমূহে যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভুতের আঁচড় লাগা শুরু করে তখন সরকারের বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের দেয়া নতুন বই দেয়ার সাফল্য, বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের আন্নদ-উল্লাস, মন্ত্রীর বা সরকারের শিক্ষাখাতে বিভিন্ন সাফল্য ধীরে ধীরে ম্লান থেকে ম্লান হতে থাকে। আজকের শিশুরা দেশের ভবিষ্যতের কান্ডারী তাদেরকে মেধা, বিদ্যা বুদ্ধি, জ্ঞান শূণ্য করার একটা হীন অপপ্রয়াস যে চলছে তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু মানুষের টাকার প্রতি অতি লোভের কারণে বিবেক বিচার বিবেচনা বুদ্ধিমত্তাকে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা আর জলাঞ্জলি দেয়ার শামিল। যাতে দেশ জাতি রাষ্ট্র এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারোচ্ছন্ন হবে, মেধা শূণ্য একটা জাতিতে রূপান্তরিত হবে যার জন্য অবশ্যই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ আর দুই লাখ মা বোন ইজ্জৎ দেয়নি। দেশের সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেনি।

অবশেষে এবারের এইচ এস সি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজেদের দায়িত্ববোধ, সচেতনতা এবং দেশ প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও জাতিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের রাহু থেকে মুক্ত করায় সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য সেটের প্রশ্নপত্র দেয়া সহ কিছু ভুলত্রুটি রয়ে গেছে, আগামীতে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর এই সাফল্য যে কোন মূল্যেই ধরে রাখা জাতির জন্য অতীব জরুরী। আসলে ইচ্ছাশক্তি, দায়িত্ববোধ, সচেতনতা, অন্যায়ের প্রতি মাথা নত না করা সহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, উপজেলা, জেলার পাবলিক পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট  সকল মহলের আন্তরিক প্রয়াস এবং সহযোগীতার হাত প্রসারিত করতে হবে। নিজেদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব সততা আর ন্যায়ের সাথে পালন করতে হবে, নিজেদেরকে লোভ লালসার ঊর্ধ্বে রাখাটা এখানে খুব জরুরী। আমরা চাইলে দেশ ও জাতির উন্নতি এবং কল্যাণের স্বার্থে দুর্নীতি, ব্যাংক ডাকাতি, ঋণ খেলাপি, মাস্তানি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শিশু, নারী শিশু , নারী নির্যাতন ধর্ষণ খুন, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি, মাদকের বিস্তার রোধ, নকল ও ভেজাল খাদ্যদ্রব্য ও ঔষধ, পরিবেশ দূষণ, পাহাড় কাটা, ভূমিদস্যুতা সহ সামজিক এবং রাষ্ট্রীয় অনেক অন্যায় অবিচার অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। যেমন সম্ভব হয়েছে জংগী তৎপরতা বন্ধে আইন শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর অনন্য সাফল্য। আসুন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের অন্যায় অবিচার রোধ করে একটা শুভ সুন্দর কুলুষ মুক্ত সমাজ গড়ে তুলি। দেশ ও জাতি নব সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহ এবং বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় আছে। 
Top