আমেরিকায় মুসলিম জীবন ধারা–জিয়া হাবীব আহ্‌সান

IMG-20180508-WA0009.jpg

—————
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রনে একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে ‘মানবাধিকার ও মার্কিন বিচার ব্যবস্থা’ শীর্ষক মাসব্যাপী ইন্টারন্যাশন্যাল লীডারশীপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। এসময় যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীসহ বিভিন্ন অংগরাজ্য পরিদর্শন করি।

পরিদর্শনকালে আলোচ্য বিষয়ের উপর জ্ঞানাজর্নের পাশাপাশি পৃথিবীর মোড়ল রাষ্ট্র মার্কিন সাম্রাজ্যে মুসলিম জীবন ধারা এবং সেখানে মুসলমানরা কেমন আছেন সে সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়। পাঠকদের অনুরোধে এ সম্পর্কে এখানে তা সংক্ষেপে আলোকপাতের চেষ্ঠা করেছি।

একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান একটি ধর্ম। সম্প্রতি গৃহীত এক জরিপে দেখা যায় যে, আমেরিকায় মসজিদের সংখ্যা ২১০৬ টি । বড় বড় শহরে মসজিদগুলো অবস্থিত । শুধু নিউইয়র্ক আর ক্যালিফোনিয়াতেই ৫০৩ টি মসজিদ আছে। যার অর্ধেকের বেশী স্থাপিত হয়েছে গত ২৫/৩০ বছরে। আমেরিকার মুসলমানদের মধ্যে ১৭ থেকে ৩০ শতাংশ ধর্মান্তরিত নওমুসলিম যারা এধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

ইসলামের সুন্দর পরিবার কেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা, মূল্যবোধ, ধর্মবিশ্বাস আমেরিকানদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ব করে আসছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসলামিক সেন্টার মসজিদের খতিব ড. আব্দেলা কউজ এপ্রসংগে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ্ এখানে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও দাওয়াতের পরিবেশ খুব ভালো কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় না। এদেশের আইন ও তার প্রয়োগ প্রশংসার দাবী রাখে। এখানে নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা একই সূত্রে গাঁথা। এক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন। এখানে কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ধর্মীয় কাজে বাধা দেওয়ার কোন আইনী বৈধতা নেই।” তিনি আরো বলেন, “ইসলাম সম্পর্কে নানা অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার কারনে সাধারন মানুষের কাছে এ সম্পর্কে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে অনুপ্রানিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোনদিন যায় না, যেদিন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এসে কমপক্ষে ১৪-১৫জন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেনা।” মসজিদে নামাজের জামাতে শরিক হতে আশাতীত মুসল্লির উপস্থিতি দেখে আমি বিমোহিত হয়েছি। মসজিদ গুলোতে বন্ধের দিন ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ছেলে মেয়েরা যাতে ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি সরে না যায় সেজন্য ইসলামী সংস্কৃতি ও নৈতিকতা সেখানে শিক্ষা দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ভাষী মুসলমানরা সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানদের মাতৃভাষা শিক্ষা ও চর্চার ব্যবস্থা রেখেছেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসনা (ইসলামিক সোসাইটি ফর নর্থ আমেরিকা) কর্তৃক পরিচালিত “দি ইসলামিক সেন্টার” পরিদর্শন কালে দেখেছি এটা মূলত একটি মসজিদ এবং মুসলমানদের মিলন কেন্দ্র। ইসলামী সংস্কৃতি ও আর্দশ প্রচারে এর ভূমিকা অনবদ্য।

রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি’র ২৫৫১, ম্যাসাস্যুটেস্ এভিন্যু এন ডব্লিউ-তে এর অবস্থান। জুমার নামাজ- এ অংশ নিতে গিয়ে দেখলাম মসজিদটিতে নীচে মহিলা ও উপরে পুরুষদের নামাজের সুন্দর ব্যবস্থা। মসজিদ সংলগ্ন পাঠাগারে প্রচুর ইসলামী সাহিত্য, কোরান তাফসির ও হাদীস শরীফ রয়েছে। মসজিদের সুউচ্চ মিনার- মিম্বর ও মেহরাব খুবই আকর্ষণীয়। কারুকার্যময় তুর্কি-টালি ও ইরানি কার্পেট দ্বারা অভ্যন্তরভাগ আবৃত। ওজু এবং টয়লেটের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে প্রথম বড় বদনা (পানির পাত্র) পেয়েছি। মার্কিন মূল্লুকের আর কোথাও তার অস্থিত্ব পাইনি। সুন্দর ইংরেজী ও আরবীতে খুৎবা দিলেন খতিব ড. আব্দেলা কেউজ, পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী ৬০-৬২ বছয় বয়সী এক সুন্দর ব্যক্তিত্ববান হাস্যোজ্জল মানুষটি। নামাজের শেষে মুসল্লিদের মাঝে বিতরনের জন্য মুসল্লিদের অনেকেই খাবার (কাচ্চি বিরিয়ানী ইত্যাদি) নিয়ে আসেন। জুমার দিন মনে হলো যেন মুসলমানদের মাঝে ঈদের খুশি বিরাজ করছে। ঈমাম সাহেব নামাজের শেষে আমাদেরকে তার হুজরায় সাক্ষাৎ ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। পরিচয় ও কথা প্রসংগে জানলাম তিনি প্রায় দেড় দশক আগে সৌদি আরব থেকে এসেছেন। তার থেকে জানলাম মার্কিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডি.সি-তে প্রতিষ্ঠিত এটি প্রথম বৃহত্তম মসজিদ। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাজার হাজার মুসলমান এখানে নামাজ পড়ে আসছেন। অনেক অমুসলিমরাও ইসলাম সম্পর্কে জানতে এখানে আসেন। আমার এক প্রশ্নের জবাবে খতিব ড. আব্দেলা কেউজ জানালেন, নাইন ইলেভেনের টু-ইন-টাওয়ার ট্র্যাজেডির পর এখানে মুসলমানদের নিরাপত্তাজনিত কিছুটা সমস্যা হয়। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ ইসলামিক সেন্টারে আসেন এবং মুসল্লিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, “আমেরিকার উন্নয়নে এখানকার মুসলমানদের বিরাট অবদান আছে। একজনের অপরাধের জন্য অন্যকে কষ্ট দেয়া যায় না।” তাঁর এবক্তব্যের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। ঈমাম থেকে আরো জানতে পারলাম আমেরিকায় মুসলমানদের হালাল ফুড এর কোন সংকট নেই। সর্বত্রই তা পাওয়া যায়। আমাদেরকে নিয়ে খতিব সাহেব খেতে বসেন এবং সুস্বাদু বাসমতি চালের পোলাও, খাসির রসা ভুনা, আস্ত তেলাপিয়া ফ্রাই, সালাত, পুদিনা চা (রুটি) ইত্যাদি খেতে দেয়া হয়। অরিগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড সফরকালে সুপরিচিত বিল্লাল মসজিদ-এ জুমার নামাজ আদায় এবং সেখানে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগ লাভ করি। নামাজ শেষে স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির সাথে লাঞ্চ ও সৌজন্য সাক্ষাৎ এর ব্যবস্থা ছিল। নারী পুরুষ (আলাদা ব্যবস্থায়) অসংখ্য মুসল্লিতে ভরে গেছে মসজিদ ও বাইরের বারান্দা। সাদা কালো, লাল বিভিন্ন রঙ্গ ও আকার আকৃতির মুসল্লিরা কাতারবন্দী হয়ে এক ঈমামের পেছনে নামাজ আদায় করলো। নামাজে যুবক ও শিশুদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। পুরো পরিবার একসাথে নামাজে চলে আসেন। ২৯টা ভাষাভাষি মুসলমানদের জন্য এ মসজিদ। এটা শুধু মসজিদ নয় মুসলমানদের ভাববিনিময় ধর্ম, কৃষ্ঠি, সভ্যতা ও ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র বিন্দু। ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার পোর্টল্যান্ড (আই.এস.জি.পি) সদস্য ও বিল্লাল মসজিদের প্রেসিডেন্ট জনাব শাহরিয়ার আহমেদ সহ কমিটির অন্যান্যরা আমাদের স্বাগত জানান ও তারা পরিবার পরিজনরা আমাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। বিলাল মসজিদ পোর্টল্যান্ড অরিগনের বিভারটন, ও আর ৪১১ এস ডব্লিউ ১৬০ এভিনিউতে অবস্থিত। রোববার ছুটির দিনে মুসলমান ছেলেমেয়েদের এখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার বিশেষ বন্দোবস্থ রয়েছে। মুসলমানরা ১৯৯৪ সালে একটি ছোট বাড়ী খরিদ করে নিজস্ব দান এর মাধ্যমে ফান্ড সৃষ্টি করে এ বিশাল মসজিদের প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর সাহাবা হযরত বিল্লাল (রাঃ) এর নামে এ মসজিদের নামকরন করা হয় ‘বিল্লাল মসজিদ’। মসজিদ পরিচালনা কমিটি স্থানীয়ভাবে শান্তি শৃংখলা অমুসলিমদের সাথে সৌহার্দপূন সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রশাসনের সাথে সহযোগিতা সহ বিশেষ অবদান রেখে আসছে। সেখানে মুসলিম এডুকেশন্যাল ট্রাষ্ট (এম.ই.টি) নামক একটি ট্রাষ্ট রয়েছে যা মার্কিন সমাজে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। তারা ইসলামের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্কলারদের মাধ্যমে লেকচারের আয়োজন, নিউজ লেটার প্রকাশ ও নিয়মিত ও সাপ্তাহিক ইসলামিক স্কুল পরিচালনা করে আসছে। আমেরিকায় মসজিদ এবং গীর্জা কে প্রার্থনা ও ধর্ম পালনের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে লাখো মসজিদকে ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও সামান্য ফোরকানিয়া শিক্ষা ব্যতিরেকে বাকী সময় কোন কাজে লাগানো হয় না। অথচ এ বিরাট মূল্যবান পবিত্র স্থান ও স্থাপনাকে শিক্ষা বিস্তারের কাজে লাগানো যায়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ইলেমেন্টারী স্কুল পরিচালনা করা যায়। যেমন গীর্জা গুলো গীর্জা স্কুল পরিচালনা করছে। এভাবে ইসলামিক সেন্টার ওয়াশিংটন ডি.সি, পোর্টল্যান্ড বিলাল মসজিদ সহ নিউইয়র্কের বেশ ক’টি মসজিদ দেখার ও নামাজ পড়ার সুযোগ হয়। ইসলামিক সেন্টার অব নিউয়ক মসজিদ এর সুবিশাল ক্যাম্পাস আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখান বাংলাদেশী মার্কিন নাগরিক জনাব আফতাব আলী। অত্যন্ত হৃদয়বান ও বন্ধুবৎসল এলোকটি ছোটবেলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, দিন দিন আমেরিকায় মসজিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে । ২০১৬ সালের তথ্যানুসারে বর্তমানে আমেরিকায় মোট ২১০৬টি মসজিদ আছে। ১৯৯৪ সন থেকে এর বৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশ । ২০ শতাংশের অধিক মসজিদ সার্বক্ষনিক স্কুল এবং অন্য গুলো সাপ্তাহিক স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ক্যালিফোর্নিয়ায় সবচেয়ে বেশী মসজিদ । ২০০৮ সালের তথ্যানুসারে, ২য় স্থানে নিউইয়র্ক ১৪০টি, ৩য় স্থানে নিউজার্সি ৮৬টি, তারপর মিশিগানে ৭৩টি, টেক্সাসে ৬৭টি, ডিষ্ট্রিক অব কলম্বিয়ায় ১১টি, মেরিল্যান্ডে ৩০টি, ভার্জিনিয়ায় ৩৭টি, নিউ ম্যাক্সিকোতে ৬টি, অরিগনে ১২টি, ওয়াশিংটন রাজ্যে ২৪টি, ওহিওতে ৬৬টি, ইন্ডিয়ানায় ২৩টি এভাবে প্রায় প্রতিটি রাজ্যে ও শহরে মসজিদ আছে। এসব সংখ্যা বর্তমানে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যার সঠিক পরিসংখ্যান মিলেনি । ২০১৬ সালের তথ্যানুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩.৩ মিলিয়ন বা ৩০ লক্ষ ৩০ হাজার মুসলিমের সংখ্যা । যা সর্বমোট জনসংখ্যার ১% । যা উকিপিডিয়া অনুসারে ৩য় । তবে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠির সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেনি। তবে এর সংখ্যা আনুমানিক ৩০-৭০ লক্ষ। জনসংখ্যাবিদরা যে হিসেব দিয়ে থাকেন তার চেয়ে বেশী মুসলমান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। হিসাবের মধ্যে তারতম্যের অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর যে ফর্ম রয়েছে তাতে কে কোন ধর্মের অনুসারী সে সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা হয় না । যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশান সার্ভিসও অভিবাসীদের ধর্ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে না। কারণ সেখানে রাষ্ট্র ধর্ম থেকে পৃথক। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান কত তার কোন সরকারী হিসেব নেই । ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় জানা যায় অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিনাঞ্চলে চাষাবাদের জন্য নিয়ে আসা আফ্রিকান দাসদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মুসলিম ছিল। ১৮৭৫ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্থিন ও ইসলাইলের গ্রামাঞ্চল থেকে বেশ কিছু মুসলমান অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল মর্মে জানা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম মহাযুদ্ধের পর ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতনের পর কিছু মুসলমান দেশ ত্যাগ করে পাশ্চাত্যে চলে আসেন। মুসলামনদের জাতিগোষ্টিগত পরিচয়ঃ- দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া ৩৩%, আফ্রিকান আমেরিকান ৩০%, আরব ২৫%, আফ্রিকান ৩%, ইউরোপীয় ২%, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ২%। আমেরিকায় অনেক মুসলিম মেয়েকে মাথায় স্কার্ফ কিংবা হিজাব পরিধান করতে দেখেছি। পুরুষদের মাথায় টুপি ও মুখে দাঁড়ি এবং রাসুল (সঃ) এর সুন্নত অনুসরন করতে দেখেছি। কর্মক্ষেত্রে মুসলমানরা নামাজ পড়ার সময় অন্যরা তাকে সম্মান করে নামাজের সুযোগ করে দিয়ে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের জীবন ধারা অত্যন্ত ফ্রি ও চলাফেরা ইচ্ছাধীন হওয়া সত্বেও সেখানে যারা ইসলামের দিকে আসছেন তারা পরিপূর্নভাবে ইসলামে আসছেন। আমরা যারা সচরাচর জন্ম সূত্রে মুসলমান তাদের মতো নয়। বরং ইসলামের পূর্ন অনুশাসন তারা অতি আগ্রহে সহাস্য বদনে গ্রহণ ও পালন করছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, তাদের অনেক ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে কিছু খেতে দিলে তারা জিজ্ঞেস করে এটা হালাল কি হারাম ? তাদের দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস আমাদের চেয়ে অনেক ভালো মনে হয়েছে। তারা জাগতিক শিক্ষাকে দ্বীনি শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে পড়ানো, আরবি ভাষার পাশাপাশি মাতৃভাষা ও ইংরেজী ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ইসলামী অর্থায়ন কর্মসূচী চালু হয়েছে। যার মাধ্যমে সুদের পরিবর্তে প্রশাসনিক ব্যয় গ্রহণ করে ঋণ প্রদান করা হয়। বাড়ী গাড়ী ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সুদ মুক্ত ঋণ প্রদান করছে এসব ফিন্যান্স কোম্পানী। নেটিভ দীন এর মুসলিম র‌্যাপ সংগীত আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে ইসলামের নৈতিক বানী প্রচার করা হয়। নেটিভ দীন গ্রুপ রসুল (সঃ) এর শিক্ষা মতো বাদ্য যন্ত্র ব্যতিরেকে অনুষ্ঠানে সাধারন ড্রাম ব্যবহার করে থাকে। এতদ সত্বেও একথা সত্য যে সেখানে অনেক মুসলাম যুবক যুবতি পাশ্চ্যত্যকে অনুসরন করতে গিয়ে নিজের ধর্মীয় নৈতিকতা ও চরিত্রকে বিসর্জন দিয়ে বিপথগামী হয়ে পড়েছে। অনেকে হারাম হালালের পার্থক্য ভুলে গিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছে। কেউ কেউ ভিন্ন ধর্মের অনুসারীকে বিয়ে করে স্ব স্ব ধর্ম পালন করছে আবার কেউ কেউ কোন ধর্মই পালন করছেন না। তবে নাইন – ইলেভেনের ঘটনার পর মুসলমানদের উপর দুর্যোগ নেমে আসে। অনেক হিজাব পরিহিত মহিলাকে লাঞ্চিত করা হয়। তারা প্রতিহিংসা পরায়ন মহলের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়। পরবর্তীতে সমবেত উদ্যোগ ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা হয়। এরপরও যে কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের দায়ভার সাধারন মুসলমানদের উপর চাপানোর ভয়ে অনেকে আতংকিত থাকে। এজন্যে পবিত্র ইসলামের নামে যে কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিহত করতে মুসলিম কম্যুনিটির মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা দেখা যায়। ২০১৬ সালে আমি স্বপরিবারে ২য়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করি । সে সময় নিউইয়র্কের জ্যামাইকাতে হেনসলি রোডস্থ বাসভবনে ফুফাতো ভাই ও আমার বাল্যবন্ধু সেলিম চৌধুরীর আতিথ্য গ্রহণ করি । সেলিম জ্যামাইকা হাসপাতালের চীফ রেসপেরিও থেরাপিষ্ট ও একজন সফল ব্যবসায়ীও । জ্যামাইকা (হিলসাইড) আবাসিক এলাকায় একটি সুন্দর জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ায় সুযোগ পাই । বাংলা ভাষা ভাষী অধ্যুষিত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত মসজিদটির চমৎকার শৈল্পিক সৌন্দর্য্য যে কোন আগুন্তকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । মহিলাদেরও নামাজের সুবন্দোবস্ত রয়েছে । মুসলিম কম্যুনিটির বদন্যতায় এই মসজিদটি সামান্য এবাদতখানা থেকে ব্যাসম্যান্ট সহ ত্রিতল ভবনে পরিণত হয়েছে । অত্যন্ত সহজ ইংরেজীতে খোৎবার তরজমা শুনলাম । জুমার নামাজ শেষে মুসলিমদের মধ্যে ঈদের আমেজ পেলাম । আজও সে স্মৃতি দেদীপ্যমান ।

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী ।

ক্যাপশনঃ
১। ওয়াশিংটন ডি সি ইসলামিক সেন্টারের সামনে লেখক ।
২। নিউইয়র্কস্থ জ্যামাইকা জামে মসজিদের সামনে লেখক ও বাংলদেশী মার্কিন নাগরিক সেলিম চৌধুরী ।

Top