আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে মাহে রমাদান

13518185_887623998032498_252620194_o1.jpg

মাওলানা এ এইচ এম আবুল কালাম আযাদ :
আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজাকে ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল। যাতে করে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। ( সূরা বাকারা ১৮৩)
অত্র আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রোজা ফরয করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন তোমাদের উপর এমনি এমনি রোযা ফরয করা হয়নি, ফরয করা হয়েছে এজন্যে যে, যাতে করে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পার, তাকওয়া অর্জন করতে পার। প্রকারন্তরে তোমরা যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য বা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পার।
আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাস হলো মাহে রমাদান। রমাদান শব্দটি রমদুন মূলধাতু থেকে উদ্ভব। আরবী অভিধানে শব্দটির দুটি অর্থ পাওয়া যায়। ১. বছরের প্রথম বৃষ্টি। বছরের প্রথম বৃষ্টির মাধ্যমে যেমন মৃত গাছপালা-তরুলতা সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠে, ঠিক তেমনি রমাদানও মানুষের মৃতপ্রায় আত্মাকে নবশক্তিতে বলিয়ান করে তোলে। ২. দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া, ধ্বংস করা। যেহেতু রমাদান মানুষের সি ত সকল পাপ- পংকিলতা, অন্যায়, অসৎ মানুষিকতা, পাশবিক কামনা-বাসনা ও আত্মার সকল প্রকার কুলষতাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয় সে জন্য এর নাম হলো রমাদান। রাসূল স. বলেন, রমাদান মাসে এক আহবানকারী আহবান করতে থাকেন, হে পুণ্যের অন্বেষণকারী! সম্মুখে ‘অগ্রসর হও’, আর হে মন্দের অন্বষণকারী! ‘থেমে যাও’। এ মাসে আল্লাহ তায়ালা অনেককে দোজখের অগ্নি হতে মুক্তি দেন আর এটা প্রত্যেক রাতেই সংঘটিত হয়ে থাকে (সুনানে তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)। অন্য হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখে তার পূর্বের সমুদয় গুনাহ (সাগীরা) মাফ করা হবে। (সহীহ বুখারী)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমাদান মাসে অনেক গুনাহগার বান্দার গুনাহ মাফ করে তার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে তার নামটা লিখে দেন। সেই রমাদান মাস আমরা পেয়েছি। আর আল্লাহ তায়ালা রমাদান মাস দিয়েছেনও পিছনের গুনাহ মাফ করে তার সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য।
গুনিয়াতুত তালেবীন কিতাবে আব্দুল কাদের জিলানী রহ. রমাদান শব্দের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন রমাদান শব্দের পাঁচটি অক্ষর রয়েছে আর একেকটা অক্ষর একেকটা অর্থ বহন করে। যেমন র মানে রিদওয়ানুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। রমাদান মাসের প্রত্যেকটা আমল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের সহায়ক। আমরা ঘুম থেকে উঠে সেহরী খাই সেখানেও আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমরা পানাহার থেকে বিরত থাকি সেটাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই করে থাকি। এখানে কোন লৌকিকতা বা রিয়ান্নাছ নেই। মানুষ যদি রিয়ান্নাছের জন্যে রোজাই রাখত তাহলে মানুষেরা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হয়ে এক গ্লাস পানি পান করে এই গরমের মধ্যে পিপাসা নিবারণ করতে পারতো। এই জন্যেই হাদীসে এসেছে- হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল দশগুণ হতে সাতশতগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়ে থাকে, আল্লাহ বলেন, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা, রোজা একমাত্র আমারই জন্য রাখা হয়, আর আমিই এর প্রতিদান দিব (আমার যত ইচ্ছা)। বান্দা আমার জন্য পানাহার পরিহার করে থাকে। রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে- একটি তার ইফতারের সময় এবং অপরটি (পরকালে) তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময়। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
আমরা ইফতার করি সেটাও তার সন্তুষ্টির জন্যেই করে থাকি। সারাদিন রোজা রেখে আমরা সকলেই যখন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, পিপাসিত থাকি তখন ইফতার সামনে আসা সত্ত্বেও খাইনা, পান করি না একমাত্র তার সন্তুষ্টির জন্যেই। আবার নির্দিষ্ট সময় হলেই সাথে সাথে আমরা ইফতার করি এটাও তার সন্তুষ্টির জন্যেই। হাদীসে এসেছে- হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় সে ব্যক্তিরা যারা শীঘ্র শীঘ্রই ইফতার করেন। (সুনানে তিরমিযী)
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় বান্দার সাথে আল্লাহর ভাল সম্পর্কের মাধ্যমে। আল্লাহর সাথে বান্দার ভাল সম্পর্ক তৈরী হয় কতিপয় আমলের মাধ্যমে। উপমহাদেশের জনপ্রিয় সীরাতগ্রন্থ ‘মুহসিনে ইনসানিয়াত’ গ্রন্থের প্রণেতা নঈম সিদ্দীকী তা’মীরে সীরাত কে লাওয়াযিম নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- আল্লাহর সাথে বান্দার ভাল সম্পর্ক তৈরী হয় ৪ টি আমলের মাধ্যমে। ১. মৌলিক ফরয ওয়াজিব ইবাদত সমূহ পালন করা। ২. কুরআন হাদীস বেশী বেশী অধ্যয়ন করা। ৩. নফল ইবাদতের উপর যথাসম্ভব গুরুত্বারোপ করা। ৪. সার্বক্ষনিক যিকির ও দোয়া করা।
মৌলিক ফরয ওয়াজিব ইবাদত সমূহ পালন করা: রমাদান মাসে ফরয ওয়াজিব ইবাদত সমূহের প্রতি গুরুত্ব বেশী দেয়া দরকার। কারণ এই মাসে একটি ফরয ইবাদত করলে সত্তরটি ফরয ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়।
কুরআন হাদীস বেশী বেশী অধ্যয়ন করা: কুরআন নাযিলের মাসে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম আমল হলো বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত করা। রাসূল সা. নিজেও এ মাসে বেশী বেশী কুরআনে কারীম তেলাওয়াত করতেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রমাদান ব্যতীত অন্য কোনো রাত্রিতে আমি রাসূল সা. কে পূর্ণ কুরআনে কারীম তেলাওয়াত করতে দেখিনি। (সহীহ মুসলিম)
হযরত ওসমান রা. প্রতিদিন একবার কুরআন খতম দিতেন। ইমাম মালেক রহ. রমদান আসলে কুরআন পড়া ছাড়া বাকী সব কাজ বন্ধ করে দিতেন। তিনি শিক্ষা দান, ফতোয়া ও লোকজনের সাথে বসা বন্ধ করে দিয়ে বলতেন এটা হচ্ছে কুরআনের মাস। ইমাম আবু হানিফা রহ. রমযান মাসে কুরআন তেলাওয়াত নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত থাকতেন যে তার সাথে মানুষেরা খুব কমই কথা বলার সুযোগ পেতো। রমযান এলে ইমাম যোহরী রহ. বলতেন রমযান হচ্ছে কুরআন তেলাওয়াত ও খানা খাওয়ানোর মাস। আল্লামা সুফিয়ান সাওরী রমযান এলে অন্যান্য সকল এবাদত বন্ধ করে শুধুমাত্র কুরআন পাঠে বসে যেতেন। তাঁরা এই মাসকে ‘সৃষ্টির সাথে বয়কট এবং ¯্রষ্টার সাথে সম্পর্কের মাস’ বলে অভিহিত করতেন।
এই মাসে কুরআন তেলাওয়াতে সওয়াবও কিন্তু বেশী। রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে, তাকে একটি নেকী প্রদান করা হয়। প্রতিটি নেকী দশটি নেকীর সমান। এই ঘোষনা অন্যান্য সকল মাসের জন্য। আর রাসূল সা. বলেছেন, রমযান মাসে বনী আদমের আমলকে দশ থেকে সাতশত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। তাহলে অন্যান্য মাসের ১০ গুন রমযান মাসের ৭০০ গুন সওয়াব। অর্থাৎ রমযান মাসে প্রতি হরফ তেলাওয়াতে বান্দা ৭০০০ সওয়াব পায়। (সুবহানাল্লাহ)
এই মাসে কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমরা বেশী বেশী নফল ইবাদত করতে পারি।
সালাতুত তাহাজ্জুদ: রমযান মাস ছাড়াও সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে বিরাট সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন, ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত তথা তাহাজ্জুদের সালাত। (সহীহ মুসলিম) রমযানের কারণে তাহাজ্জুদ নামাযের আরো বেশী ফযিলত রয়েছে। যেহেতু সাহরী খাওয়ার জন্য উঠতেই হয় সেজন্য রমাদান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে।
বেশী বেশী দোয়া ও তাওবাহ করা: তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে আমরা আমাদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী দোয়া করতে পারি, অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করে তাওবাহ করতে পারি। আশা করা যায় আল্লাহ আমাদের গুনাহ মাফ করবেন কারণ রাসূল সা. বলেছেন, এ মাসে আল্লাহ তায়ালা অনেককে জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তি দেন আর এটা প্রত্যেক রাতেই সংঘটিত হয় (সহীহ বুখারী)। তাই আল্লাহর দরবারে নিজের গুনাহ মাফের জন্যে বেশী বেশী তাওবাহ করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ কর, খাটি তাওবাহ, আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত (সূরা আততাহরিম- ৮)। রাসূল সা. বলেছেন, “হে মানবসকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর, আর আমি দিনে তাঁর নিকট একশত বারেরও বেশী তাওবাহ করে থাকি।” (সহীহ মুসলিম) যার কোন গুনাহই নাই তিনি দিনে একশত বারেরও বেশী তাওবাহ করতেন, তাহলে আমরা কি আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী তাওবাহ করতে পারিনা? গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার অন্যতম আমল হলো তাওবাহ করা। কেননা হাদীসে এসেছে তাওবাহকারী গুনাহ থেকে এমনভাবে ফিরে আসে যে, তাওবাহ করার পর আর কোন গুনাহই তার থাকে না (সুনান ইবনে মাজাহ) ।
বেশী বেশী দান সদাকাহ করা: তাওবাহ যেমন মানুষকে গুনাহ থেকে মুক্ত করে ঠিক তেমনি দান সদাকাও মানুষকে গুনাহ থেকে মুক্ত করে থাকে। যেমন হাদীসে এসেছে সদাকাহ গুনাহগুলোকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যেমনিভাবে পানি আগুনকে মিটিয়ে দেয় (সহীহ আত-তারগীব ওয়াততাহযীব)। রমাযান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো বেশী বেশী দান সদাকাহ করা। ইয়াতীম, গরীব, মিসকীন ও অসহায়দের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ও বেশী বেশী দান খয়রাত করা। হিসাব করে এ মাসে যাকাত দেয়া উত্তম। কেননা নবী কারীম সা. এ মাসে বেশী বেশী দান খয়রাত করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সা. ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল, আর রমাদানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত (সহীহ বুখারী)।
বেশী বেশী যিকির করা: রমাদান মাসে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের আরো একটি মাধ্যম হলো বেশী বেশী যিকির করা, আল্লাহকে ডাকা, আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবো।’ (সূরা বাকারা ১৫২) আবু ওসমান মাহদী বলেছেন, আল্লাহ আমাদেরকে কখন স্মরণ করেন তা আমি জানি। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি তা কেমন করে জানেন? তিনি উত্তরে বলেন, কুরআনে আল্লাহর উপরোক্ত ওয়াদা অনুযায়ী জানি যে, যখন আমরা তাকে স্মরণ করবো তখন তিনিও আমাদেরকে স্মরণ করবেন (মা’আরেফুল কুরআন)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন, তোমরা আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করো, সম্ভবতঃ তোমরা সাফল্য লাভ করবে (সূরা জুম‘আ ১০)। রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে এবং যে ব্যক্তি যিকির করে না, তার উদাহরণ হচ্ছে, জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো’ (সহীহ বুখারী)। আমরা এই মাসে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে বেশী বেশী তার যিকির করতে পারি। সোবহানাল্লাহর যিকির, আলহামদুলিল্লাহর যিকির, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যিকির। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন – সর্বোত্তম যিকির হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (ইবনে মাজাহ, নাসাঈ)।
রহমত, বরকত, মাগফেরাতের মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে ফরয ইবাদতের পাশাপাশি বেশী বেশী নফল ইবাদত বন্দেগী করে তার সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে আমাদেরকে কবুল করে নিন। আমীন।

লেখকঃ
সভাপতি- বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ, টাঙ্গাইল জেলা।

Top