হালদা নদী বাঁচলে সমৃদ্ধ হবে দেশের মৎস্য সম্পদ-মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী

unnamed.png

========================
পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশের একমাত্র মিটে পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদায় গত বারো বছর পর মা মাছ সর্বোচ্চ ডিম ছেড়েছে গত ১৯ তারিখ রাত থেকে ২০ তারিখ সকাল পর্যন্ত। এবারের ডিমের পরিমাণ হল ২২,৬৮০ কেজি যা গত বছরে ছিল মাত্র ১,৬৮০ কেজি তবে ২০০৬ সালে তা ছিল ৩২,৭২৪ কেজি।

উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় – ডলফিনের ( হুতোম মাছ ) মৃত্যু হালদার জন্য আশীর্বাদ হয়েছে। যে সময়ে মাছ ধরা পড়ে সেসময় ডলফিনের মৃত্যুর কারণে প্রশাসনের কড়া নজরদারি বেড়ে যায়। হালদা দূষণ কিছুটা বন্ধ করা, রাবার ড্যামের আয়তন কমানো, নদীর উভয় তীরে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে কেউ যেন মা মাছ শিকার করতে না পারে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ডলফিন মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরাসরি মনিটরিং করা হয়।

রেলপথ সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং রাউজানের সাংসদ ফজলে করিম সাহেবের বিভিন্ন তৎপরতা, উদ্যোগ, কর্ম নির্দেশনাও এখানে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। এক সেমিনারে তিনি ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন – হালদার গবেষণার জন্য কোটি টাকা প্রদান করা হলেও মৎস্যজীবীদের বরাদ্দ মাত্র ১ লক্ষ টাকা। হালদায় মাছই যদি না থাকে তাহলে গবেষণা করে কি লাভ।

প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা বন উজাড় করি, পাহাড় কেটে সমতল করি, খাল বিল, নদী নালা, খেলার মাঠ, জলাশয়, পুকুর, ফসলী জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করি, আবর্জনা বর্জ্য ফেলে বিষাক্ত করি নদীর পানি। বিভিন্ন কলকারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, ইটের ভাটা, লক্কড় ঝক্কড় মার্কা গাড়ি, সারকারখানা, জেনারেটর, নৌযান সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে নির্গত দূষিত, কুলষিত, কালো ধুঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস, ধুলোবালি বায়ুমণ্ডল এবং পরিবেশকে দূষিত করছে অবিরত। ফলশ্রুতিতে পরিবেশ প্রতিবেশ বনজ জীব জন্তু কীট পতঙ্গ, জলজ প্রাণী সর্বোপরি দেশের জীব বৈচিত্র্যও আজ ভয়াবহ এবং ভয়ংকর হুমকির সুম্মুখীন।

প্রকৃতির উপর এতো অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার আর ধ্বংসের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান মনে হয় সবার শীর্ষে। ব্যতিক্রম নয় আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে, মানুষের জীবন জীবিকায়, কৃষিকাজে, সুপেয় পানি সরবরাহ সহ জাতির বিভিন্ন কল্যাণে অবাদান রাখা হালদা নদীটিও মনুষ্য জাতির অন্যায় অবিচারে দিন দিন অপ-মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর নাব্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বালু উত্তোলনের ড্রেজারের পাখার আঘাতে গত বছর বেশ কয়েকটি মা মাছ মারা গেছে। মারা গেছে বেশ কয়েকটি ডলফিন এবছরের জানুয়ারি থেকে। আশার কথা ইতিমধ্যে ১৭ টি বালুর মহাল বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শ্যালো ইঞ্জিন বা ইঞ্জিন চালিত বোট বা নৌকার ব্যবহৃত তেল মুবিল অবাধে ফেলা হচ্ছে পানিতে। আবার এসবের পাখার আঘাতেও মা মাছের মৃত্যু ঘটে থাকে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীট নাশক, সার, বিভিন্ন ঔষধ ছিটানোর পর অবশিষ্ট অংশ এবং সরঞ্জামাদি পরিষ্কার করা হচ্ছে নদীর পানিতে, বিভিন্ন ফসলে ব্যবহৃত কীট নাশক মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে বাজারে নেয়ার পূর্বে তরিতরকারি শাক সব্জি তা অনেক্ষেত্রে ধোয়া হচ্ছে নদীর পানিতে। মরা জীব জন্তু, সেপ্টিক ট্যাংকের মল, আবর্জনা মাটিতে না পুতে তা ফেলা হচ্ছে নদীতে যা পানিকে দূষিত করছে প্রতিনিয়ত। তার উপর আছে বিভিন্ন আবাসিক এলাকার বর্জ্য এবং কল কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য যা ইটিপি প্লান্ট্যের মাধ্যমে পরিশোধিত হওয়ার কথা তা না করে পড়ছে হালদাতে যা নদীর পানিকে দূষিত এবং কালো করে ফেলছে।

একটি সূত্র থেকে জানা যায় – “শহরের বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ হচ্ছে হালদা নদী বিশেষ করে অক্সিজেন ও কূলগাঁও এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক বর্জ্য সরাসরি এ নদীতে পড়ছে।আগেএসব বর্জ্য বামনশাহী খাল হয়ে কর্ণফুলী নদীতে যেতো। কিন্তু অনন্যা আবাসিক হওয়ার পরবামনশাহী খালে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়”।

মহান রাব্বুল আলামিনের অপূর্ব দান হালদার প্রকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটি। হালাদার মা মাছের অভয়ারণ্য সৃষ্টির দাবী যুগের পর যুগ থেকে করে আসছে সংশ্লিষ্ট সবাই। কিন্তু তার জন্য কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি অদ্যাবধি। আশার কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার জন্য তাগাদা দেয় এবং পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় – দুইটি এন জি ও, মৎস্য বিভাগের তৎপরতা, বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ, ১ টি দ্রুতগামী সহ ৩ টি স্পীড বোটের মাধ্যমে টহলের ব্যবস্থা করা, মাছ শিকারিদের উক্ত বোটগুলোতে যুক্ত করে নজরদারি বাড়ানো এবং কোথাও মাছ শিকারের খবর পেলে দ্রুতগামী স্পীডবোটটির দ্রুত সেখানে ছুটে যাওয়া, ডিম ছাড়ার সময় নদীতে জোয়ার থাকা ইত্যাদি কারণে এবার ডিম সংগ্রহ বেশী হয়েছে। আরও একটি কারণ জানা গেছে, গেল বছরের কয়েকবারের বন্যায় নদীর উভয় তীর ভাঙ্গনের কবলে পড়া এলাকার পুকুর ডুবে যাওয়ায় প্রচুর মাছ নদীতে এসে যাওয়ায় মা মাছের সংখ্যাও বেড়ে যায়।

হালদা নদীকে মৎস্যের অভয়ারণ্য তথা প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্বল্প মাঝারী দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। ড্রেজিং এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বাড়ানো, অবৈধ মাছ শিকার, নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধ, আবসিক ও কারখানার বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা বা কারখানার বর্জ্য ইটিপির পরিশোধিত করে নদীতে ফেলা, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধকরণ যদিও ইতিমধ্যে বালু তোলার ড্রেজার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বালু মহাল বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, পানি দূষণ ও মাছের বিচরণে বাঁধাগ্রস্ত হয় এমন ইঞ্জিন চালিত নৌযান চলাচল বন্ধ করা, মাছ ছাড়ার মৌসুমে জেলেদের পুনর্বাসন বা কাজের ব্যবস্থা করা, মরা জীব জন্তু ও সেপ্টিক ট্যাংকের ময়লা আবর্জনা নদীতে না ফেলে মাটিতে পুতে ফেলার ব্যবস্থা করা, অবৈধ কারেন্ট এং বিভিন্ন ধরণের জাল ব্যবহার এবং মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা। পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা, স্পিডবোটের সংখ্যা বাড়িয়ে তদারকি আরও জোরদার করা।

নদী রক্ষা, পানি দূষণ মুক্ত এবং মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে জন সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় প্রতিনিধি এবং উভয় তীরের বসবাসকারীদের সংযুক্ত করা। ভরা বর্ষায় পোষ্টার ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে এলাকাভিত্তিক নৌকা বাইচের, বছরের অন্যান্য সময় পদযাত্রা বা শোভাযাত্রা সহ নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করা জরুরী। রাউজানের সাংসদ এ বি এম ফজলে করিম এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর আশা করি দেশের একমাত্র মিটা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র রক্ষায় আরো কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে কিন্তু হালদা নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে এবং সমৃদ্ধ হবে দেশের মৎস্য সম্পদ।

Top