এক মাসে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে নিহত ১৫,আহত ১৬

download-6-1.jpg

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া,স্টাফ রিপোর্টার :
প্রতিদিনেই নীল আকাশ এই ভাল এই মন্দ। ক্ষনিকের মধ্যেই রুপ বদলায়। কোন সময় নেই কালো মেঘে আচ্ছন্ন আর বজ্রপাতে অতিষ্ট হাওরবাসী। কালবৈশাখী ঝড় আর বজ্রপাত এবার যেন মরার উপর খারার ঘাঁ হয়ে সামনে এসে দাড়িয়েছে হাওরবাসীর। প্রতিদিনেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বজ্রাঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসহায় কৃষক। গত এক মাসের ব্যবধানে বজ্রপাতে ১৫জন নিহত হয়েছে। এছাড়াও আহত হয়েছে ১৬জনের অধিক। জেলার.তাহিরপুর,জামালগঞ্জ,ধর্মপাশা,বিশ্বম্ভরপুর,দিরাই,শাল্লা,ছাতক,দোয়ারা-বাজার উপজেলায় বজ্রপাতের আগাতে মারা যায়। পরিবারে একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিটিকে হারিয়ে নির্বাক পরিবার ও আপনজনরা। হাওর পাড়ের আকাশ-বাতাশ এখন প্রিয়জন হারোনোর কষ্টে ভারী হচ্ছে। ফলে সামনের দিন গুলোতে সারাক্ষনেই প্রিয়জন হারানোর আতœংক বিরাজ করছে জেলার সর্বস্তরের জনসাধারন মাঝে।
গত দুই বছর অকাল বন্যায় ৯০শতাংশ এক ফসলী বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শোক কিছুটা এবার লাগব হয়েছিল ভাল ফসল হওয়ায়। কিন্তু হাওরপাড়ের এখন সেই আনন্দে বাদ সেধেছে কালবৈশাখী ঝড় আর বজ্রপাত। অকাল বন্যায় বোরো ধান পানিতে না ডুবালেও হাওরাঞ্চলে এবার যেন এবার মৃত্যুর মিছিলে পরিনত হয়েছে হাওরে। অন্য দিকে বজ্রপাত,ঝড়-বৃষ্টির কারনে রৌদ না থাকায় ধান কাটা,মাড়াই ও শুকানোর কাজ করতে পারছে না কৃষকগন। হাওরে প্রকৃতির এই বিরুপ নির্মমতায় হতবাক আর পাকা ধান নিয়ে দিশেহারা কৃষক। রাত নামলেই নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষায় বজ্রপাত ও ঝড়ের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাত্রি যাপন করছে নিজ বাড়িতেই।
শুধু সুনামগঞ্জ জেলাই নয় হবিগঞ্জ,মৌলভী বাজার,নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে একেই অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানাযায়। বজ্রপাত প্রতিরোধক যন্ত্র স্থাপনের দাবী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দ্রুত নেওয়ার প্রয়োজন বাদী উঠেছে হাওরবাসীসহ সর্বমহলে।
বজ্রপাতে গত ১মাসের ব্যবধানের ১৫জন নিহত হয়েছে। তারা হলেন,১লা মে-সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লারপাড়া ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের রশিদ মিয়া (৪৫) ও একেই দিনে জামালগঞ্জ উপজেলা কমলা কান্ত তালুকদার (৫৫)। তিনি জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের খোজারগাঁও গ্রামের মৃত কৃষ্ণধন তালুকদারের ছেলে। একেই উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতা গ্রামের মুক্তার আলীর ছেলে হিরণ মিয়া (৩০),বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের মৃত সাইদুর রহমানের ছেলে আলম মিয়া (৫০)।
০৪মে শুক্রবার সকালে মোহাম্মদ জাফর মিয়া(৩৬) নামে এক জন বজ্রঘাতে মারা যায়। তিনি উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামের মৃত লাল মামুদ আলীর ছেলে।
৫মে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের গৌরারং (ইসলামগঞ্জ) ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী একা রানী দাশ (১৮)। তিনি গৌরারং ইউনিয়নের সাফেলা গ্রামের রাদিকা দাশের মেয়ে। ও একই গ্রামের মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে এখলাছুর রহমান (৫০)।
৭মে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরে সকালে বজ্রপাতে নবকুমার দাস (৬৫) নামে এক কৃষক নিহত হয়েছে। তিনি উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের পুলিশ কর্মকর্তা এসআই নগেদ্র দাসের পিতা।
৮মে তাহিরপুর উপজেলায় সদর ইউনিয়নের ভাটি তাহিরপুর গ্রামের মুক্তুল হোসেনের ছেলে কৃষক নূর হোসেন (২২),একেই দিনে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় দক্ষিন বাদাঘাট ইউনিয়নের পুরানগাঁও গ্রামের হযরত আলীর স্ত্রী শাহানা বানু(৩৫),একেই উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের ক্ষিরদরপুর গ্রামের সুরমা বেগম(২২),দোয়রা বাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের ডুববন্ধ গ্রামের আরশাদ আলীর ছেলে ফেরদৌস (১২),দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নেরটংগর গ্রামের মৃত ফজর আলীর ছেলে মুসলিম উদ্দিন(৭৫)।
৯মে বুধবার সকালে শাল্লা উপজেলার কালিয়াকুটা হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হন আলমগীর হোসেন (৩২),তিনি উপজেলার কাশীপুর গ্রামের ইসহাক মিয়ার ছেলে। একেই সময়ে ধর্মপাশা উপজেলার কালনী হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে উজ্জল মিয়া (১৫) নিহত হয়েছে। তিনি উপজেলার দূর্বাকান্দা গ্রামের রহিম উদ্দিনের ছেলে। সবাই নিজ হাওরে বজ্রাঘাতে মারা যায়।
বজ্রপাতে আহতরা হলেন,জামালগঞ্জের সৈকত তালুকদার (১৫),তার সহোদর পিংকু তালুকদার (২৫) ও একই গ্রামের জ্ঞান তালুকদার (৪৫)। তাহিরপুর উপজেলায় শনির হাওরে পাশ্বভর্তি ইউনিয়ন বাদাঘাট থেকে ধান কাটতে আসা শ্রমিক লিয়াকত মিয়াসহ ১৬জন।
কাল বৈশাখী ঝড় শহরের ইট কাঠের ঘড় গুলোতে আঘাত করে কোন ক্ষতি না করতে পারলেও হাওর পাড়ের বসবাসকারী অসহায় জনসাধরনের টিনেরঘর,গাছ-পালা,মাটি ও ছনের তৈরী ঘর গুলোকে শিলা বৃষ্টি ও কাল বৈশাখী ঝড়ের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এপর্যন্ত শতাধিক বাড়ি-ঘর ক্ষতি আর শতাধিক আহত হয়েছে।
পিযুস পুরকাস্থ টিটু সহ জেলার হাওর পাড়ের কৃষক ফেরদৌস আলম,সাদেক আলী,সবুজ মিয়াসহ হাওর পাড়ের বিভিন্ন দ্বীপ সাদৃশ্য গ্রামের কৃষক পরিবারের সদস্যরা বলেন,এবার জেলার প্রতিটি হাওরেই বোরো ধানের ফলন ভাল হয়েছে। তবে আবহাওয়ার বৈরী আচরনে আমাদের আবারও চিন্তার মধ্যে আছি। বজ্রপাত ও বৃষ্টি হলেই আতœংকের মধ্যে থাকি। পাহাড়ী ঢলে বাঁধ ভাঙ্গার ভয়ে। আর বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা ধান কাটতে হাওরে যেতে চায় না মৃত্যুর ভয়ে। হাওরের কৃষকের জীবন বাচাঁতে বজ্রপাত প্রতিরোধক যন্ত্র স্থাপনের পাশা পাশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবার দাবী করেন হাওরবাসীর।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান,প্রকৃতির বৈরী আচরন হাওর পাড়ে কৃষকগন নিজেদের মত করে পরিবারে লোকজন নিয়েই পাকা বোরো ধান কেটে শেষ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বজ্রপাত তারা সব সময় দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। বজ্রপাত প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া খুবেই প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জ সিভিল সার্জন আশুতুষ দাস জানান,জেলার প্রতিটি উপজেলার এখন প্রয়োজনীয় গাছ নেই যা পূর্বে ছিল। যা ফলে বজ্রপাতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বজ্রপাতে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট পাঠানো হয়।

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খানঁ বলেন,হাওর গুলোতে তালগাছ সহ বেশী পরিমানে গাছ লাগানো এবং আকাশে মেঘাচ্ছন্ন থাকলেই বজ্রপাত হবার পূর্বে সর্তকতাবস্থা অবলম্ভন করে নিরাপদ স্থানে থাকা ও সবাই সচেতনতার অবলম্ভন করতে হবে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাবিরুল ইসলাম বলেন,প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রনালয় বজ্রপাতের বিষয়টি গুরুত্ব সাথে দেখছে। মানুষকে সচেতন করার নানা কর্মসূচি গ্রহন করা হয়েছে। বজ্রপাত নিরোধে বিগত মৌসুমে এই জেলায় ৩০হাজারের মত তাল গাছ রোপন করা হয়েছে। এছাড়াও দূযোর্গ মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে সবাই উপকৃত হবে।

Top