আমার মা সবার মা—হোসনেয়ারা

32458572_784449871942601_8416567107520561152_n.jpg

—————————–
পৃথিবীতে যদি কোন মধুর শব্দ থেকে থাকে সেটি হচ্ছে মা। যে নামে দুনিয়ার সবটুকু সুখ ঝরে পড়ে সেই নামটি হলো মা। অতি ক্লান্ত ভরা মন, কর্মে ভরা দেহ, ঘাম ঝরা শরীর কতই না পীড়াদায়ক। সে সময়ে যে নাম ধরে ডাকলে পরান জুড়িয়ে যায়, সে প্রিয় ডাকটি মা। যে আঁচলে সবচেয়ে বেশি মমতা, সে-যে মায়ের আঁচল। মা দশ মাস দশ দিন সন্তানকে গর্ভে লালন-পালন করেন পরম যতনে। তখন থেকেই সন্তানের সাথে মায়ের মনোঃসংযোগ গড়ে ওঠে। বড় পীর আব্দুল কাদের জ্বিলানী মায়ের গর্ভে থাকতেই আঠারো পারা কোরআন শরীফ খতম করেছেন। সন্তানকে পূর্ণতা দিতে তখন মাকে সাবধানে চলা-ফেরা করা লাগে, ভালো খাবার খেতে হয়, মনোঃনিবেশ করে ধর্ম-কর্ম করতে হয়, ভালো ভালো চিন্তা করতে হয়। এতে সন্তান পরিপূর্ণভাবে শারিরীক ও মানসিকভাবে বিকশিত হয়ে গড়ে ওঠে।

দিনে দিনে বিকশিত হতে হতে একসময় শিশু পৃথিবীর আলো-হাওয়া, স্নিগ্ধ ছায়া, দেখতে পায়। মায়ের গায়ের গন্ধে শিশু পরম আবেগে লালিত হতে থাকে। দীর্ঘ দিনের সান্নিধ্যে মা-শিশুতে গড়ে ওঠে নিবিড় সখ্যতা। শিশুর ইশারা মা বুঝতে পারে। ইশারাতে চলতে থাকে ভাবের আদান-প্রদান। মায়ের কোল-ই শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখানেইতো আমাদের মহানবী (সা:) থমকে গিয়েছিলেন। দুধ’মা বিবি হালিমাকে মাথার পাগড়ি বিছিয়ে বসতে দিয়েছিলেন। একটি দুধ পান করে অপরটি দুধ ভাই আব্দুল্লাহ্’র জন্য রেখে দিতেন। মায়ের প্রতি এতো মোহ, এতো ভালোবাসা, এতো আবেগ, এতো আকর্ষণ হতেই তো প্রিয় নবী (সা:) সাহাবীদের প্রশ্নের জবাবে তিন বার’ই মায়ের সেবার কথা বলেছেন। এভাবে মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশ্ত নির্ধারণ করে রেখেছেন। “তার মতো হতভাগা আর নেই, যে মা-বাবা কে কাছে পেয়েও তাদের সেবা-শুশ্রুষা করলো না।” হাদিসে এসেছে, “মাকে পুরো সম্মান দেখাতে হবে, আচার-আচরণে বিনয়ী হতে হবে ও খিদমত করতে হবে” এতেই মুক্তি।

আমার মা ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর দুপুর বাদ ৩টা ১০ মিনিটে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছেন। মাকে ভুলতে পারছি না। মা ছিলেন অসামান্য রূপবতী। দুধে আলতা গায়ে বরন যেন কাঁচা সোনা। মুখের গঠন গোলাকার। চক্ষু যুগল কালো ডাগর ডাগর। ঠোঁট দুটো গোলাপের পাঁপড়ির মতো। স্নিগ্ধ কোমল কথোপকথন। পোশাকে আশাকে মার্জিত, ব্যবহারে অতিশয় নম্র। দু’ঠোঁটে সদা মুচকি হাসি লেগে থাকত। আব্বাদের তিন ভাইয়ের ঘরের সকল ছেলেমেয়েরা আমার মাকে ‘মা’ বলে ডাকতো। তিনি তার ভালোবাসার আঁচল ছায়ে সবাইকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। এজন্যই তো ওরা এখনো তাদের মায়ের চেয়ে আমার মায়ের কথা বেশি বলে।

মায়ের সহজ সরলতা ছিল অন্যতম গুণ। এটা তাকে সবার মাঝে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। অন্তরটা বড়ই সাদা। যেখানে ছিলনা কোন ঘষা-মাজা, কাটা-কাটি, ওভার রাইটিং কিম্বা ফ্লুইডের ব্যবহার। কাউকে কোন কথা দিলে কথাটি রাখতেন। না পারলে বলে দিতেন। এজন্য এলাকাবাসী সকলেই মাকে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করেছেন। মা ছিলেন সততার আদর্শে উজ্জ্বল। কখনো কাউকে ঠকানো, ফাঁকি দেয়া, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, অন্যের হক নষ্ট করা বা কারো সাথে এতটুকু প্রতারণার আশ্রয় নেন নি। অনেকে ওনাকে নানা ভাবে ঠকালেও তাদের তিনি উদার হৃদয়ের বিশালতায় ক্ষমা করে দিয়েছেন। মা ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন সত্যবাদী। মহানবী (সা:) বলেছেন, “তোমরা সত্যবাদী হও, কারণ সত্য পুণ্যের পথে এবং পুণ্য জান্নাতের পথে পরিচালিত করে।”

সৌজন্যতা বোধ মায়ের একটি বড় গুণ। কারো সাথে দেখা হলে মুচকি হেসে কুশল বিনিময় করতেন। সংশ্লিষ্ট জনের খবর নেয়া, পরিবারের খোঁজ নেয়া, বাড়িতে আসতে বলা, সমস্যা থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রতিটি সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসতেন। মায়ের শালীনতা পুরো পাড়ায় তাঁকে অসাধারন ‘মা’ হিসেবে পরিণত করেছে। মা ছিলেন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর।আত্মত্যাগের মন ছিল বলে সবার জন্য করতেন। কুরবানী ঈদে গোশত বন্টন হয়ে গেলেও নিজের অংশ থেকে তিনি বিলিয়েছেন। গাছের বিভিন্ন ফল-ফলাদী কত যে ফকির-মিসকিনকে বিলিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা কি জিনিস তিনি তা জানতেন না। নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে শিখিয়েছেন সন্তানদের। আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা কত অহংকার করি, শিক্ষার বড়াই করি, পোশাকের বড়াই করি, চাকরির গরিমা দেখাই, কখনো সত্যকে মিথ্যে বানাই, আবার মিথ্যেটাকে সত্যে সাজাই। এই বিশেষ দিকগুলো যে করা উচিত নয় তা মায়ের কাছে জেনেছি। মা সবসময়ই পাড়া-প্রতিবেশী ও গরীব আত্মীয়-স্বজনদের খবর নিতেন। তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। আত্মীয়দের হক সম্পর্কে কোরআনে এসেছে, “সত্যিকার ধর্মপরায়ণ তারা, যারা ধন-সম্পদের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্তেও আত্মীয়-স্বজনদের দান করেন।”

খিদমতে খালক মা চরিত্রের অন্যতম গুণ। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী, পশু-পাখি, কুকুর-বিড়াল এমনকি একটি পিঁপড়াকেও তিনি মারতেন না। প্রতিটি জিনিসের পরিমিত ব্যবহার করেছেন। মহানবী (সা:) বলেছেন, “সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহ’র পরিজন। আল্লাহ’র কাছে সেই ব্যক্তি প্রিয়, যে তার পরিজনদের প্রতি বেশী অনুগ্রহশীল।” আল্লাহ ভীতি বা তাকওয়া ছিল মায়ের সেরা গুণের একটি। মহান আল্লাহ সবকিছু জানেন, জানতেন এবং ভবিষ্যতেও কি হবে তা বলতে পারেন। এই বোধটুকু মায়ের অন্তরে ছিল বলে তিনি মুখে যা বলতেন অন্তরেও তাই করতেন। শিশু বা কৈশোরে কোরআন পড়তে পারেন নি। সবকিছু বুঝে যৌবনে এসে একমাত্র বড় বোনের কাছে অনেক ধৈর্য্য নিয়ে কোরআন শিখেছেন। তাকওয়াকারী ব্যক্তি জানেন, সবাইকে ফাঁকি দেয়া গেলেও আল্লাহ্ কে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। চরিত্র গঠনে তাক্ওয়া একটি সুদৃঢ় দূর্গ স্বরূপ।

‘মা’ তোমার মৃত্যুর এতগুলো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু কেন তোমাকে ভুলতে পারছি না? প্রতি পলে পলে তুমি ধরা দাও কল্পলোকে কিম্বা স্বপ্নলোকে। অনেক বৃক্ষরোপণ করেছো যা সাদকায়ে জারিয়া হয়ে তোমার জন্য দোয়া করছে। হে দোয়াময় রাব্বুল আলামীন, আমার মা-কে তুমি জান্নাতুল ফেরদাউসে আসীন করে দাও। যেখানে কোন দুঃখ নেই, শুধু সুখ আর সুখ। যেখানে মা-য়ের পরিধেয় বস্ত্র কখনো পুরনো হবে না, যেখানে মা সবসময় হাস্যোজ্জ্বল ও সুস্থ থাকবেন। অসুস্থতা তাঁর ধারে কাছেও আসতে পারবে না। যেখানে দুঃখ-বেদনা, দুশ্চিন্তা-গ্লানি, বিপদ সংকট থেকে তিনি মুক্ত থাকবেন। যেখানে মা চির-যৌবনা হয়ে থাকবেন, বার্ধক্য তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে না। মা-য়ের কখনো মৃত্যু হবে না। সেখানকার সবপাত্রই হবে সোনা দিয়ে তৈরি। সবুজ লতা-পাতা, রঙ-বেরঙের ফুল-ফলাদি, ঝর্ণা ধারা, নদী, সাগর, পাহাড়, নীল নীলান্ত, অবারিত মাঠ, সুন্দর পাখ-পাখালী, রাখালের বাঁশি, সবুজ ধানক্ষেত যেখানে রয়েছে , রাতের আঁধার দ্বারা মা’কে সেথায় তুমি উষালগ্নের বারতায় আচ্ছাদন করে রাখ।

মা তুমি সবার জন্য দোয়া করো। কারণ তুমি যে সবার ‘মা’।

রেখক-
হোসনেয়ারা
গ্রামীণ ব্যাংক,যোনাল অফিস, নারায়ণগঞ্জ।

Top