ছোট গল্প–“আজিব ভাই” –হাবীব রায়হান

received_1893126227646418.jpeg

——————–
অফিস শেষে আজিব ভাই বাসায় ফেরার জন্যে বাসস্টপের দিকে পা বাড়ালেন। রাত আটটা কি সাড়ে আটটা। আকাশে প্রচণ্ড মেঘ, ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, বোধ করি এখনই বৃষ্টি নামবে। বাসস্টপে পা রাখতে না রাখতেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল, যাত্রীছাউনিতে গুটিকয় লোক বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে। আজিব ভাই ঘামের সাথে বৃষ্টির ফোটাগুলো মুছতে মুছতে দেখলেন বাস এসে গেছে।
যাত্রীতে ঠাসা বাসের ভিতরটা, কোনোরকম দুপায়ে ভর দিয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়াতে হলো সদ্য ওঠা যাত্রীদের। হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছে বাস। বৃষ্টির শব্দ আর বাসের দুরন্ত গতি দুয়ে মিলিয়ে এক ভয়ংকর চিৎকারের মত শুনাতে লাগলো। ঝড়ের ঝাপটায় রাস্তার দুধারের গাছগুলো বারবার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে যেন।
পরবর্তী স্টপেজে আসতেই হুড়হুড় করে প্রায় যাত্রী সব নেমে গেল। এরা সবাই গার্মেন্টসকর্মী ছিল। প্রতিদিনই এরা দলবেঁধে কাজে যায় আবার রাতে দলবেঁধে ঘরে ফেরে।
এতক্ষণে বসার ফুরসত পেয়ে আজিব ভাই হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বাস খালি হওয়াতে আজিব ভাই লক্ষ্য করলেন পিছনের দিকে দুটি মেয়ে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। তাদের কেমন যেন ভীত দেখাচ্ছে। বাসে এখন সব মিলিয়ে ৬/৭ জন। আবার চলতে শুরু করলো বাস। কিছুক্ষণ পর আরো তিনজন নেমে গেল। ঝড় থেমে গেছে এতক্ষণে কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে এখনো। নির্জন রাস্তা, চারিদিকে শুনসান নিস্তব্ধতা। বাসের চাকায় আবার গতি লাগলো।
একজন বাসকর্মীকে হন্তদন্ত হয়ে জানালার পর্দাগুলো লাগিয়ে দিতে দেখে আজিব ভাই সোজা হয়ে বসলেন। তিনি কিছু একটা গণ্ডগোলের আভাস পেলেন। চকিতে মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে দেখলেন তারা ভীত হরিণীর মতো তারই দিকে তাকিয়ে আছে। চালকের সাথে আরেক হেল্পার কি যেন বলছে হাত নাড়িয়ে। তারা মেয়েদুটিকে নিয়েই যে কিছু বলছে এটা অনুমান করে আজিব ভাই বাসে অবশিষ্ট পুরুষযাত্রীর সাথে কী যেন একটু কথা বলে নিলেন।
হঠাৎ বাস থেমে গেল, ড্রাইভার আজিব ভাইদেরকে নামার ভঙ্গি করে বললো বাস আর যাবেনা। বিস্ফোরিত চোখে আজিব ভাই দাঁড়ালেন, প্রতিবাদ করে উঠলেন “কেন যাবেনা বাস?” তিনজন এসে জোর করে নামিয়ে দিতে যাচ্ছে তাদের, আজিব ভাই সিট থেকে বের হলেন, মেয়েদুটিকেও নামার ইশারা করলেন। এক জানোয়ার আগলে ধরলো তাদের পথ আর দুটো উন্মত্ত কুকুর ঝাপিয়ে পড়লো ওদের ওপর। সাথে সাথে আজিব ভাইদের উপর বেধড়ক মারধর শুরু হয়ে গেল। এর আগেও চলতি বাসে মেয়েদের একা পেয়ে ধর্ষণের ঘটনা শুনেছে আজিব ভাই কিন্তু এভাবে যে তাকে ঘটনার সাক্ষী হতে হবে একথা সে ভাবেনি কোনোদিন।
ভয়ে নেমে গেল পাশে থাকা লোকটি। আজিব ভাই নামলেন না। আবার বাস চলতে শুরু করলো।
হন্যে কুকুরের মত খাবলে খাচ্ছে ওরা মেয়েদুটিকে। “বাঁচাও” “বাঁচাও” চিৎকারে গুমরে উঠছে বৃষ্টিস্নাত এক রাত। যন্ত্রনা আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে মেয়ে দুটি। খানিক পরে গোঙ্গানোর আওয়াজ শুনতে পেলেন আজিব ভাই, বুঝলেন ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলেছে ওরা। নিজের দুটি বোনের কথা মনে পড়ে গেল তার। মেয়ে দুটির স্থলে নিজের বোনদের কল্পনা করে জ্বলে উঠলেন তিনি। শরীরের সমস্ত শক্তিকে একত্র করে লাথি মারলেন এক হায়েনাকে, ককিয়ে উঠলো সে। সেসময় শরীরে এক দুর্বার শক্তি অনুভব করলেন, মেরে আহত করলেন কয়েকজনকে। কিন্তু পারলেন না, একা আর কী করবেন? অবশেষে হায়েনারা মেরে অজ্ঞান করে ফেললো তাকে। মেয়ে দুটি সর্বশক্তি দিয়ে হাত পা ছুঁড়ছে বাঁচার জন্যে। যার ভরসায় ছিল তাকে অজ্ঞান দেখে নিরুপায় নিঃসহায় মেয়ে দুটি স্তব্ধ হয়ে গেল। বাকি শয়তানগুলো লোলুপ দুষ্টিতে আপেক্ষা করছে নিজের পালার জন্যে। পালাক্রমে ধর্ষণ করবে ওরা। তারপর হয়তো মেরে ফেলবে ওদের, লুকিয়ে ফেলে দেবে কোনো এক ডোবায় বা ধানের ক্ষেতে।
“ওস্তাদ পুলিশ” চেচিয়ে উঠলো এক কাপুরুষ। হঠাৎ কড়া ব্রেকে থমকে দাঁড়ালো বাস। রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ। আজিব ভাই নিকটস্থ থানায় জানিয়ে দিয়েছিলেন আগেই।
জানালা দিয়ে লাফ দিল ড্রাইভার। বাকিরাও পালানোর চেষ্টা করলো। রাস্তার দুই ধারে মাঠ ছিল, সবগুলোকে ধরে ফেললো পুলিশ।
বাসে মেয়েদুটির কোনো ভাই ছিলনা কিন্তু আজিব ভাই দাঁড়িয়েছিলেন তাদের আপন ভাই হয়ে। যদি অচেনা একজন লোক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরোধ না করতো, জীবনের ভয়ে যদি আজিব ভাইও পালিয়ে যেতেন, তাহলে কী হত অসহায় মেয়ে দুটির?
কিছুদিন পর আজিব ভাই সুস্থ হয়ে গিয়েছিল হয়তো, কিন্তু মেয়ে দুটি কি আদৌ সুস্থ হতে পেরেছে? কোনোদিন কি পারবে সুস্থ হতে? যে জাতির পুরুষেরা একা পেলেই তার শরীর খাবলে খেতে চায় তাদের প্রতি ঘৃণা কি দুর হবে কোনোদিন? তারা শুধু শ্রদ্ধা করে আজিব ভাইদের। সমাজের কুলাঙ্গাররা যখন তাদের ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করে, তখন জীবন বাজি রেখে এগিয়ে আসে আজিব ভাইরাই।

বছরখানেক পরে এর বিচার হয়। দুজনের একবছর করে জেল হয়, আর বাকিদের নামকাওয়াস্তে কিছু জরিমানা করে খালাস দেয়া হয়। সেদিন মার খেয়ে অজ্ঞান হয়েও আজিব ভাই যে কষ্ট পাননি আজ তার চেয়ে বহুগুন বেশি কষ্ট পেলেন বিচারের রায় শুনে। আকাশের দিকে তাকিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি।

এভাবেই শত শত বোনের আর্তচিৎকার আর আজিব ভাইদের দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে যায় দিগন্তে….।

লেখক—শিক্ষার্থী- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Top