রাবির ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক হত্যায় ২ জনের ফাঁসি ও ৩ জনের যাবজ্জীবন

download-6.jpg

আব্দুর রহিম,রাবি প্রতিনিধি :
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যা মামলার রায় দিয়েছে আদালত।
রায়ে ২ জনের ফাঁসি ও ৩ জনের যাবজ্জীবন সাজা ঘোষনা করেছে আদালত। সাথে প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রায় ঘোষনা করেন রাজশাহীর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শিরীন কবিতা আখতার। হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই বছর পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- প্রধান আসামি শরিফুল ইসলাম (পলাতক) ও মাসকাওয়াত হাসান ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে সাকিব।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে নীলফামারীর মিয়াপাড়ার রহমত উল্লাহ, রাজশাহীর নারিকেলবাড়িয়া এলাকার আবদুস সাত্তার ও তার পুত্র রিপন আলী। এ সময় শরিফুল ইসলাম ছাড়া অন্য আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি ছিলেন এ্যাডভোকেট এমদাদুল হক বাবু। আসামিপক্ষের আইনজীবি ছিলেন এ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম।
গত ২০ আগস্ট মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। দুপুর ১২:২০টা থেকে ৪২ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক গত ১১ এপ্রিল শেষ হয়। পরে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য ৮ মে দিন ধার্য করা হয়। রাজশাহীর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক শিরীন কবিতা আখতার যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেন।
রাজশাহীর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি (পাববলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট এন্তাজুল হক বাবু বলেন, মামলায় মোট ৩২ জন সাক্ষী ছিলেন। তবে ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণার জন্য এদিন ধার্য করা হয়। তবে পুলিশ এখনও হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং মামলার প্রধান আসামি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্র শরিফুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
উল্লেখ্য যে, রাবির ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে
২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকালে রাজশাহীর শালবাগানস্থ নিজের বাড়ি থেকে রাবিতে আসার পথে তাকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরে তার ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী ‘কোমলগান্ধার’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনেরও উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়া অধ্যাপক রেজাউল করিম ভালো সেতার বাদক ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি একটি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করেছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রায় সাত মাস তদন্তের পর ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আটজনকে আসামি করে তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজশাহীর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক রেজাউস সাদিক আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
ড. রেজাউল করিম হত্যা মামলার অভিযুক্ত ৮ আসামির মধ্যে খায়রুল ইসলাম বাঁধন, নজরুল ইসলাম ওরফে হাসান ওরফে বাইক হাসান ও তারেক হাসান ওরফে নিলু ওরফে ওসমান এরইমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
অভিযুক্ত অন্যরা হলেন- বগুড়ার শিবগঞ্জের মাসকাওয়াত হাসান ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে সাকিব, নীলফামারীর মিয়াপাড়ার রহমত উল্লাহ, রাজশাহীর নারিকেলবাড়িয়া এলাকার আবদুস সাত্তার ও তার ছেলে রিপন আলী, রাবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী শরিফুল ইসলাম। এর মধ্যে শরিফুল ইসলাম এখনও পলাতক। আবদুস সাত্তার জামিনে রয়েছেন। বাকি আসামিরা কারাগারে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এন্তাজুল হক বাবু আরও বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জীবিত এবং মৃত আসামিদের সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছেন। তাই রায়ে জীবিত আসামিদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এতে তারা সন্তুষ্ট।
এদিকে অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার আসামি জেএমবি সদস্য শরিফুল এখনও গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহত শিক্ষকের মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতভি।
শতভি বলেন, শরিফুল ছিলো তার বাবার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। কিন্তু সে এখনও গ্রেফতার হয়নি। বিষয়টি তাদের খুবই কষ্ট দেয়। তারা শরিফুলের বিচারই আগে দেখতে চান।
শরিফুল অধ্যাপক রেজাউল ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। অধ্যাপক রেজাউল করিমের গ্রামের বাড়িও বাগমারায়। তাই তাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শরিফুল পলাতক রয়েছেন।
তবে অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আটক এক আইএস জঙ্গির সঙ্গে শরিফুলের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে জানিয়েছিল ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। তাই শরিফুল এখনও ভারতেই আত্মগোপন করে আছেন বলে ধারণা করছে রাজশাহীর পুলিশ।
শরিফুলকে ধরিয়ে দিতে রাজশাহীর পুলিশ (আরএমপি) দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো। কিন্তু আজও তার হদিস মেলেনি। এজন্য তাকে পলাতক দেখিয়েই মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করেছে আদালত।

Top