এডভোকেট এ এম য়্যাহয়্যাকে স্মরণ-মামুনুর রশিদ

1493298492.jpg

মামুনুর রশিদ:
২০০৭ এর ৬ই মে ৭২ বছর বয়সে এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা ইন্তেকাল করেছেন। তিনি যেন জান্নাত লাভ করেন আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা। কারণ, আমরা শ্রদ্ধাভাজন য়্যাহয়্যা সাহেবকে বহু জনকল্যাণমুলক কাজের সাথে জড়িত থাকতে দেখেছি। তিনি ধার্মিক মানুষ ছিলেন, তাই কল্যাণকর সব কাজই শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করতেন বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্বাসটা পোক্ত এ কারণে যে, তাঁর কৃত জনকল্যাণমুলক কাজগুলো থেকে তাঁকে কোন ব্যক্তিগত ফায়দা ওঠাতে দেখা যায়নি।
তিনি একাধারে আইনজীবী, ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, সমবায় আন্দোলনের নেতা, লেখক ওমুক্তিযুদ্ধের সহযোগী ছিলেন। প্রতীয়মান হয়, তাঁর প্রত্যেকটি ভূমিকার পেছনে ছিল সততা, আন্তরিকতা, জনকল্যাণের মানসিকতা এবং দেশপ্রেম। জীবনের এই ধাপগুলোর প্রত্যেকটিতেই তিনি দক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন। সমাজে আজ এমন দরদী মানুষের বড় অভাব।
জনাব য়্যাহয়্যা’র অন্তরঙ্গ বন্ধু বিচারপতি জনাব আমিরুল কবির চৌধুরী তাঁর এক লেখায় বলেছেন, “আজকের সমাজে বিরাজমান সততার মরুভূমিতে য়্যাহয়্যা ছিলেন অনুসরণীয় ব্যতিক্রম। সারাজীবন সততার সাথে আইনের জগতে ও সমাজ জীবনে দায়িত্ব পালন করে গেছেন য়্যাহয়্যা অনেকটা নীরবে। সে জীবন তাঁকে উপহার দিয়েছে বরেণ্য সন্তান-সন্ততি এবং রূহের মাগফিরাত কামনায় শোকাহত বন্ধু-বান্ধব ও এলাকাবাসী।”
ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁর অবদান সম্ভবত কখনোই ভুলতে পারবে না চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীর তৎকালীন বৃহত্তর গুমানমর্দন ইউনিয়ন (ছিপাতলী, নাঙ্গলমোড়া ও গুমানমর্দন নিয়ে গঠিত) কাউন্সিলের জনগণ। কারণ এই ইউনিয়নের সর্বত্র তাঁর কীর্তি ছড়িয়ে রয়েছে কালের সাক্ষী হিসাবে। এলাকার উন্নয়নে এবং বাসিন্দাদের জীবনমানের উন্নতিকল্পে তিনি এতবেশী কাজ করে গেছেন যে, মনে হয় তিনি তাঁর চেয়ারম্যানশীপের মেয়াদকালের একটি দিনও বৃথা নষ্ট করেননি। তাঁর এলাকাটি শস্যভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত হলেও কোন বড় সড়ক, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদী অবকাঠামো মোটেও ছিল না। অথচ জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এই ধরনের অবকাঠামো থাকা অপরিহার্য। তিনি রীতিমত গ্রামোন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেন। গ্রামের মানুষ থানা সদরে যাবার কোন স্বচ্ছন্দ রাস্তা ছিল না।তিনি গুমানমর্দন ডিসি রোডকে মাটি কাটিয়ে সর্বপ্রথম রিক্সা চলাচলের উপযুক্ত করে তোলেন এবং পরে নাঙ্গলমোড়া বাজার থেকে সরকারহাট পর্যন্ত নাজিরহাট পাকা সড়কের সাথে সংযোগ স্থাপন করে দেন। গ্রামের জনগণ প্রথমবারের মত সহজ ও স্বচ্ছন্দে বড় সড়ক হয়ে থানা সদর পর্যন্ত যাতায়াতের সুযোগ লাভ করেন। এতে করে শস্যপ্রধান ঐ এলাকার শস্য বাইরে নিয়ে বিক্রি করারও সুবিধা হয় কৃষকদের। বোয়ালিয়া খালের উপর বাঁশের একটি টলমল সেতুছিল, উপর দিয়ে যাতায়াত করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তিনি সেতুটি পাকা করে দেন। একটি পাকা সেতু স্থাপন করে দিয়ে তিনি ছিপাতলী ও নাঙ্গলমোড়া গ্রামকে সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্বচ্ছন্দ ও সহজ করার জন্য তিনি কাটাখালি খালের উপরও একটি পাকা সেতু করে দেন। আজকাল এত সড়ক ও সেতু চেয়ারম্যানতো দূরের কথা অনেক এমপি’র কাছ থেকেও পাওয়া যায় না। একটি বন্যাকবলিত এলাকা Ñ যেখানে যুগ যুগ ধরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল ডিঙ্গি বা সাম্পান Ñ সে এলাকাকে রাস্তা ও সেতু স্থাপনের মাধ্যমে (১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তাঁর চেয়ারম্যানশীপের সময়) গাড়ী চলাচলের উপযুক্ত করে দেয়া কোন সহজ কাজ ছিল না। কত আন্তরিকতা, কত দৌড়াদৌড়ি, কত পরিশ্রম, গাঁটের কত টাকা খরচ করে এসব কাজ সরকারের কাছ থেকে আদায় করে আনা সম্ভব নিশ্চয় তা সকলের বোধগম্য।
হালদা নদীর তীব্র ভাঙ্গন থেকে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল ও জনপদ রক্ষার জন্য তিনি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে দেন। নদী ভাঙ্গনের ক্ষয়ক্ষতি দেখানোর জন্য তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর স্টিমার যোগে তাঁর এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি সেচ কাজের জন্য তাঁর গ্রামে প্রথমবারের মত সেচ পাম্পের প্রচলন করেন। কৃষকদেরকে উন্নত বীজ দেয়া, গ্রামে চিকিৎসার জন্য ডাক্তার নিয়ে যাওয়া, ঔষধের ব্যবস্থা করা, স্কুল-মাদ্রাসা করে দেয়া ইত্যাকার জনসেবামুলক হেন কাজ নেই যা তিনি করেননি। আজকাল গ্রাম পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদেরকে এসব কাজ করতে খুব একটা দেখা যায় না। সে সময় জনাব য়্যাহয়্যা ঐ ধরনের সব কাজ সরকারী বরাদ্দ দ্বারা যে করেছেন তা নয়, বরং বহু কাজ করেছেন নিজ উদ্যোগে এবং ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। যদিও তিনি ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি ছিলেন না। নিজের আইন ব্যবসা দ্বারা উপার্জিত অর্থই তিনি এসব জনসেবা মুলক কাজে ব্যয় করেছেন। যেমন, তিনি সে সময় গ্রামে প্রায় একশত টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়নে যেমন সহায়তা করেছেন, তেমনি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনার উন্নয়নেও অবদান রেখেছেন। গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান আজো সেখানকার মানুষ স্মরণ করেন। তিনি গ্রামকে হানাদার ও রাজাকার মুক্ত রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ঐসময় বিশেষকরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে কোন ধরনের নিপীড়নের শিকার না হন তার সুব্যবস্থা করেন। তাঁর সময়ে সেই গ্রামের একজন সংখ্যালঘুকেও দেশত্যাগ করতে হয়নি। সবার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। যার কারণে স্বাধীনতার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ হতে একাধিকবার তিনি স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সমবায় গড়ে তোলার প্রতি তাঁর প্রচুর আগ্রহ ছিল। সমষ্টিগত প্রচেষ্টা ছাড়া তাঁর গ্রামের দারিদ্র পীড়িত মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি আসবে না Ñ এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি গ্রামের মানুষকে সমবায় গঠনের মাধ্যমে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন এবং তাতে সফলও হন। তাঁর এই সাফল্যের কারণে পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের জয়েন্ট সেক্রেটারী, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের পরিচালক, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ জুট মিলস এর পরিচালক, চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় সমবায় ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল, চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক এর প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম ডাইবেটিস এসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী এসোসিয়েশনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিষ্টার্ড র্গ্যাজুয়েট প্রভৃতি সংস্থার আজীবন সদস্য ছিলেন ।
তিনি ‘কোরআন হাদীসের দো’য়া’ এবং নবী করীম (সঃ) এর অসিয়ত’ শীর্ষক দু’টি পুস্তক রচনা করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জায়তুন-য়্যাহয়্যা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ দ্বারা তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বহু সেবা মুলক কাজ করে গেছেন যার ধারা আজো অব্যাহত রয়েছে তাঁর উত্তরসুরীদের মাধ্যমে। তিনি ৬ কন্যা ও ১ পুত্রের জনক। তাঁর স্ত্রী জায়তুন আরা (মরহুমা)ও সমাজসেবী ও দরদী মহিলা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন।
জনাব য়্যাহয়্যা সত্যিকার সমাজ সেবকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশাল অর্থ-বিত্তের মালিক না হয়েও শুধুমাত্র আন্তরিকতা, দরদ, সততা ও উদ্যমের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের জন্য কত-কী করা যায় তা দেখিয়ে গেছেন তিনি। সময় কাজে লাগানোর ব্যাপারে তিনি খুবই সচেষ্ট থাকতেন। সময় অত্যন্ত মূল্যবান এবং একজন মানুষের সময় (আয়ু) খুব কম Ñ এটা তিনি উপলব্ধি করতেন এবং জানতেন, তাই সময় (আয়ু) যাতে বৃথা নষ্ট না হয় সে ব্যাপারে যারপরনাই সতর্ক থাকতেন। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে কোন না কোন ভালো কাজে ব্যয় করাই ছিল তার সাধনা। তাই আল্লাহপাক তাঁকে যথেষ্ট ভাল কাজ করে যাবার তওফিক দিয়েছেন। প্রার্থনা করি, তাঁর সমস্ত ভাল কাজগুলো আল্লাহপাক কবুল করে নিন এবং তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখকঃ সংবাদকর্মী, প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থকার ।

Top