একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে একজন আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধির ভুমিকা

1493298680.jpg
আবু মোহাম্মদ এমরান (বীর মুক্তিযোদ্ধা):  
আজ ৬ই মে আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সমবায় আন্দোলন ও গ্রাম উন্নয়নের পুরোধা মরহুম এ এম য়্যাহ্য়্যা ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী । চট্টগ্রামের মুক্তি সংগ্রামে হাটহাজারীর গুমানমর্দন এর তদানীন্তন চেয়ারম্যান এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা এবং এলাকার জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অপরিসীম। আমি গ্রামের সন্তান হিসেবে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি। অত্র এলাকার মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু বিক্ষিপ্ত স্মৃতি এখানে তুলে ধরার প্রয়াস চালাবো। হাটহাজারীর বর্তমান ছিপাতলী, নাঙ্গলমোড়া ও গুমানমর্দন এ তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে তদানীন্তন বৃহত্তর গুমানমর্দন ইউনিয়ন। মুক্তি সংগ্রামে আমার বড় ভাই এবং বৃহত্তর গুমানমর্দন ইউনিয়নের ভূমিকা অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি দেশে যারা প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠন করেছেন, হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাদের আজ পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। এদের মধ্যে কাটাখালী স্কুলের মাস্টার কুদ্দুস, জনাব আহমদ উল্লাহ, উকিলের বাড়ির জনাব মোহাম্মদ শফি, জনাব নূর আহমদ মাস্টার, তাঁর ভাই ইউছুপ মাস্টার, মরহুম সেজোয়ার খাঁন, পেশকারের ছেলে জহুরুল আলম, নুরুল আমিন (এডভোকেট), মীনা গাজী চৌধুরী বাড়ির ফজল করিম, দেলোয়ার পাশা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বহুমুখী অবদান রাখেন। বিশেষ করে আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই বৃহত্তর গুমানমর্দনের তদানীন্তন চেয়ারম্যান এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যার অবদান অত্র এলাকাবাসী এবং পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কখনো ভুলবে না। তিনি পুরো গ্রামকে হানাদার এবং রাজাকার মুক্ত রাখতে তাঁর মেধা এবং যোগ্যতাকে কাজে লাগান। ইউনিয়ন কাউন্সিল ভবনসহ গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ গ্রামকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেন। তিনি তাঁর ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কোন একজন সংখ্যালঘুকে দেশ ত্যাগ করতে দেননি। এজন্যে দেশ স্বাধীন হলে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাঁকে একাধিক স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেন। এলাকায় রাজাকার নিয়োগে বাধ্য করার জন্য খান সেনারা একবার তাঁকে হত্যার জন্যও নিয়ে যায়। কিন্তু তিনি যুক্তি দিয়ে তাদের বুঝাতে সক্ষম হন যে, এ সুন্দর গ্রামটিতে রাজাকার নিয়োগ দিলে গ্রামবাসীর শান্তি বিঘিœত হবে। একবার গুমানমর্দনে সেনা অভিযানের সংবাদ পেয়ে তা তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়ে দেন এবং এলাকাবাসীদের নিয়ে ডি.সি. রোড কর্দমাক্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে দিলে তথায় পাঞ্জাবী আর্মি প্রবেশ করতে পারেনি। তার কারণে হিন্দু মুসলমান মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা পায়। মরহুম এডভোকেট য়্যাহ্য়্যা সাহেব যুদ্ধ চলাকালীন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মেম্বার ছিপাতলীর শেখ নুরুজ্জামান (আওয়ামী লীগ নেতা), নাঙ্গলমোড়ার আবু তাহের (ন্যাপ নেতা) প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা সংগঠকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তারা নিজ নিজ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।
তাছাড়া এর পূর্বে থেকেই বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এদেশের প্রতিটি যুবক, আবালবৃদ্ধবনিতার রক্ত টালমাটাল করে তোলে। বঙ্গবন্ধুর এ আহবান আমাকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করে। ৭১ সালে আমি স্থানীয় নাঙ্গলমোড়া হাইস্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। একদিন শুনতে পেলাম আমাদের গ্রাম তথা চেয়ারম্যানের বাড়ি আক্রমণ হবে। আমরা সপরিবারে নদী পার হয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকলাম। এ ধরনের পরিস্থিতি আমাকে বিদ্রোহী করে তোলে। আমি তখন ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে মনস্থির করলাম। বদন চৌধুরীর বাড়ির আবু তাহের তখন এইচএসসির ছাত্র। তার সাথে পরামর্শ করে কিভাবে ট্রেনিংয়ে যাবো ঠিক করি। তিনি সহ নিজ বাড়ির রফিকুল আনোয়ার, আবুল কাশেম, ছিপাতলীর আজিজুল হক, পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর গ্রামের সেনা সদস্য জাহাঙ্গীর ও মনছুর প্রমুখ আমরা সংগঠিত হয়ে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। কাটাখালীর মাস্টার কুদ্দুস, নাঙ্গলমোড়ার ছমদ ভাই ও আনোয়ার আজীম ভাই আমাদের সংগঠিত করে পায়ে হেঁটে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আমাদের এ গ্রুপটিকে খিরামের পূর্বে বরকতুল্লাহ খামারে পৌছানো হয়। সেখান থেকে ২ জন পাহাড়ি চাকমার সহায়তায় প্রায় ৫০/৬০ মাইল হেঁটে দুর্গম জঙ্গল অতিক্রম করি। মমকান্তি চৌধুরী নামক এক চাকমার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করি ও কিছুক্ষণ পর আবার যাত্রা শুরু করি। তারপর নতুন ২জন চাকমার হাতে দায়িত্ব পড়ে আমাদের পথ দেখানোর। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তারা রামগড় বর্ডারে নদী পার করায়। সীমান্তের ওপারেই ভারত। সেখানে একটি রেজিস্ট্রেশন অফিসে নাম তালিকাভূক্ত করি। তারপর সাবরুম নামক স্থানে হাটহাজারীর প্রাক্তন এম.পি শ্রদ্ধাভাজন এম.এ ওহাব সাহেবের সাক্ষাৎ পাই। তিনি তথায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের ট্রেনিং গ্রহণের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত হাটহাজারীর মুক্তি সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। এ মহান ব্যক্তিত্বের অবদান কোন দিন ভুলার নয়। তিনি আমাদের কুশলাদি জেনে নেন। বড় ভাই এলাকার চেয়ারম্যান এবং আমাদের লোক হওয়ায় পাকিস্তানিরা তার ক্ষতি করতে পারে এ আশংকাও করলেন। তবুও তিনি আমাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি সেখানে এক রাত আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ পদব্রজে আমাদের পা ফুলে যাওয়ায় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করেন। এরপর গাড়ি করে তিনি আমাদের হরিণা “ইয়ুথ ক্যাম্পে” পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ১৭ দিন সেখানে রেখে হালকা ট্রেনিং তথা প্যারেড করানো হয়। ১৬/১৭ দিন পর বাছাই করে ত্রিপুরা পলটনা নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শারীরিক ডাক্তারি পরীক্ষার পর কাপড় চোপড়/ড্রেস দেয়া হয়। এক এক গ্রুপের জন্য এক একজন হাবিলদার নিয়োগ দেয়া হয়। সেখান থেকে মার্চ করে প্রতিদিন ২ মাইল দূরে মূল ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে প্রায় ৩১ দিন পর্যন্ত ট্রেনিং চলে। দিনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ তথা অস্ত্র ব্যবহার, খোলা, বাঁধা ইত্যাদি এবং রাতে ব্রীজ ধ্বংস, আক্রমণ, মাইন পোতা ইত্যাদি গেরিলা ট্রেনিং শিখানো হয়। ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সৈন্যরা ট্রেনিং দেয়। ট্রেনিং এ উত্তীর্ণদের পরবর্তীতে ‘ইয়ুথ ক্যাম্পের’ পার্শ্বে আর্মি ক্যাম্পে এনে এক সপ্তাহ ডিউটি করানো হয়। আমাদেরকে অস্ত্র দিয়ে একজন কমান্ডারের নেতৃত্বে সেখান থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়। আমাকে দেয়া হয় এস.এল.আর। দেশে আসার পথে জুইগ্গাছড়া বাজারের পার্শ্বে হানাদার বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। চাকমাদের পাহাড়ের ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় পাকিস্তানি আর্মি মিজোদের সাহায্যে আমাদের উপর আক্রমণ করে। আক্রমণের মুহুর্তে সেন্ট্রিরা আমাদের জাগিয়ে দিলে আমরা উপর্যুপরি গ্রেনেড চার্জ, এস.এল.আর. স্টেনগান ইত্যাদির সাহায্যে পাল্টা আক্রমণ চালাই। ৪ ঘণ্টা পর গোলাগুলি বন্ধ হয়। অত:পর অবস্থা বেগতিক দেখে তারা সেখান থেকে কেটে পড়ে। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ আমরা স্বাধীন করার শপথ নিই। পাক সেনারা পার্শ্বের এক শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের বাড়িতে খেয়ে আবার বিকেলে আমাদের আক্রমণ করতে আসে।
কিন্তু আমাদের দুর্বার প্রতিরোধের মুখে তারা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। এতে পাক বাহিনীর বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এরপর আমরা দেশের মূল ভূখন্ডের দিকে চলে আসি। সিটি গ্রুপ, ভিলেজ গ্রুপ ইত্যাদিতে বিভক্ত হয়ে যার যার এলাকায় চলে যাই। আমাদের কোম্পানি প্রধান ছিলেন আমিনুল হক, তিনি সেনা সদস্য ছিলেন। প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন আবু তাহের (পরবর্তীতে থানা কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত হন) ও গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন নুরুল হুদা। এরপর নিজ ইউনিয়নে এসে কয়েক মিনিটের জন্য মায়ের সাথে দেখা করি। মা বুকে জড়িয়ে ধরে মোরগের গোস্ত দিয়ে কয়েক গ্রাস বিন্নি ভাত খাওয়ায়ে দিয়ে দোয়া করে বিদায় দিতে গিয়ে বললেন “তোমার বড় ভাই (এডভোকেট য়্যাহ্য়্যা চেয়ারম্যান) মুক্তিযুদ্ধের ৪/৫ জন ছেলে এনে আমাকে সান্ত¡না দিত এবং বলতো তোমার ছেলেও এদের মত অন্য জায়গায় থেকে যুদ্ধ করছে।”
গুমানমর্দন ইউনিয়নের লোকজনকে দেখে খুব হাসিখুশি মনে হল। আমার দাদা (বড় ভাই) এডভোকেট এ.এম. য়্যাহ্য়্যা চেয়ারম্যান সাহেব নিজের জীবনবাজি রেখে গ্রামকে হানাদারমুক্ত রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ বিচরণস্থলে পরিণত করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করে এই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয় নিত। এরপরও আমরা গ্রামকে হানাদারমুক্ত রাখি। মুক্তিযোদ্ধারা সরকার হাটের পূর্বে ১১,০০০ ভোল্টের বিদ্যুৎ লাইন বিছিন্ন করে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেন। কাটিরহাট রাজাকারন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের মুখোমুখি সংঘর্ষে আমরা সাহসিকতার পরিচয় দেই। গুমানমর্দনের দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শেখ আলীম উল্লাহ ও দলিলুর রহমান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ট্রেনিং এর জন্য অন্যান্য যুবকদের সংগঠিত করে ভারতে নেওয়ার সময় পথিমধ্যে শহীদ হন। পাক সেনা বাহিনীর রকেট আক্রমনে মৃত্যুর পূর্বে পর্যন্ত তারা শত্রুদের উপর গ্রেনেট চার্জ করে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। মোহাম্মদ য়্যাহয়্যাকে এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দেশের প্রথম বিজয় দিবসে বিরাট গণসংবর্ধনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে ২টি স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ পুরস্কার দিয় সম্মানিত করেন। তিনি নগদ অর্থ সমূহ স্থানীয় স্কুলে দান করে দেন। সমবায় আন্দোলন ও গ্রামোন্নয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি নিজ গ্রামের উন্নয়নে মেধা, শ্রম, অর্থ ও যোগ্যতাকে কাজে লাগান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ‘জয়তুন-য়্যাহয়্যা’ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট গঠন করেন এবং তথায় বিপুল অর্থ দান করে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।
আমি মনে করি তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তার নামে হাটহাজারীর যে কোন একটি সড়কের নামকরণ করা উচিৎ। গুমানমর্দন ডি.সি. রোডের নাম শহীদ আবদুল আলীম সড়ক নামকরণ করা হয়। পার্শ্ববর্তী ধলই গ্রামও হাটহাজারীর প্রতিরোধ সংগ্রামে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। সাবেক সেনা প্রধান মুক্তিযোদ্ধা লেঃ জেঃ হারুনুর রশীদ বীর প্রতীক এ গ্রামেরই সন্তান। মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর গুমানমর্দন এর কৃতী সন্তান মোবারক ভাই (ঢাকার সাবেক জেলা প্রশাসক ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সাবেক ডাইরেক্টর) এর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায় যে দুর্বার প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, তাতে উত্তর হাটহাজারীর অবদান খুবই বেশি। এলাকার বিপুল সংখ্যক নাগরিক মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও এলাকাবাসীকে সংগঠিত করতে বিভিন্ন ব্যক্তি বিরাট অবদান রাখেন। তালিকাভূক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি আমি আজ তাদের পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। অত্র এলাকার মু্িক্তযোদ্ধারা তাদের স্মৃতি থেকে এ সকল ব্যক্তি ও তাদের অবদান সম্পর্কে লেখালেখি করলে তাদের নতুন প্রজন্ম তাদেরও প্রাণ ভরে শ্রদ্ধা করতে পারবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আহবানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করে তারই আহবানে ঢাকা স্টেডিয়াম মাঠে অস্ত্র জমা দিয়ে দেশ গড়ার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। অস্ত্র জমা প্রদান অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেন, দেশে যদি আরো তিন বছর যুদ্ধ চলতে থাকে তাহলে কি তোমারা যুদ্ধ করতে না?” আমরা হাত তুলে সমস্বরে উত্তর দিই অবশ্যই। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি তিন বছর তোমাদের কিছু দিতে পারব না। দেশ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়”। এ আহবান আজো আমার মনে পড়ে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের চার বছরের মাথায় এ নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক জাতির জনককে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। দেশ রক্ষা সকলের পবিত্র ঈমানী দায়িত্ব। এ মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাই। কোন বিনিময় পাওয়ার জন্য নয়। স্বাধীনের পর সরকার আমাদের জন্য কিছু টাকা ও চাল বরাদ্দ করে। আমি তা আমার প্রতিবেশী গরিব চাচা মরহুম হাফিজুর রহমানের স্ত্রীকে পাওয়ার ব্যবস্থা করি। আমি দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় পুনরায় আমাদের জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ হয়। আমি ও আমার সহযোদ্ধা রফিক এবং শফি তা স্থানীয় স্কুল ছাত্রাবাসের জন্য দান করি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও মুক্তিযুদ্ধে সঠিক অবদান যাঁরা রেখেছেন অনেক ক্ষেত্রে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। যদিও নিভৃত পল্লীর আত্মপ্রচার বিমুখ এসব মহান ব্যক্তিরা তাদের নামে প্রচার চায় না। তবুও আমরা যাতে তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে পারি তার জন্য অত্র এলাকাসহ দেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রদান ও ভূমিকা পালনকারীদের অবদান নিয়ে প্রকৃত ইতিহাস রচিত হওয়া আবশ্যক। যাদের নাম অজানা রয়েছে তাদের নামও প্রচার মাধ্যমে তুলে ধরা হোক। এটাই আজকের দিনে আমার মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যাশা। মুক্তিযুদ্ধের আড়াই যুগ পার হয়েও মুক্তিযুদ্ধে বিরাট অবদান পালনকারী গ্রাম গুমানমর্দন আজো অবহেলিত। এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো মধ্যযুগীয়। হালদা নদীর ভাঙনে হাজারো পরিবার আজ গৃহহারা। এ এলাকার দুঃখী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি খুব সুখী হতাম। কিন্তু তা হয়নি। সুন্দর পৃথিবী যতদিন থাকবে, আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ ততদিন স্বাধীন-সার্বভৌম থাকুক একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটাই আমার একমাত্র কামনা। আজকের এই দিনে আমি আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এডভোকেট মরহুম আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা সাহেবের অবদান স্মরণ করছি এবং বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা (সনদ নং ম ৫৩১০৫) ও মরহুমের কনিষ্ট ভ্রাতা।
প্রাক্তন শিক্ষক, পশ্চিম গুমানমর্দন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
Top