রুহিয়ায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গরুর ঘাইন ও শৈশবের কিছু স্তৃতি কথা।।

IMGIMG_20180420_143219_895.jpg

গৌতম চন্দ্র বর্মন :
ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়ার প্রায় বিশ বৎসর পূর্বে গ্রাম অঞ্চলে প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী এই গরুর ঘাইন এর মাধ্যমে সরিষার তেল তৈরী হত। এরা ঘাইনে ভাঙ্গানো তেল এবং খৈল নিয়ে ঘাইন ছিক্যা ভারের মাধ্যমে কাঁধে বহন করে গ্রাম অঞ্চলের বাজার গুলোতে এবং গ্রামের প্রতিটি বাড়ী বাড়ী গিয়ে তেল বিক্রয় করত। আর এই তেল দিয়ে গ্রাম অঞ্চলের মানুষ তাদের তেলের চাহিদা পুরণ করত এবং সরিষা ভাঙ্গানো খৈল গরুর খাবার হিসাবে ব্যবহার করত।

এই ঘাইন তেল এবং সরিষা ভাঙ্গানো খৈল বিক্রয় করে তাদের পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন এতে করে সুখে শান্তিতে তাদের দিন চলে যেত। যুগের প্রেক্ষাপটে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই গরুর ঘাইন প্রায় হারিয়ে গেছে। এখন শধু মাত্র স্মৃতি হয়ে এই প্রচীনতম গরুর ঘাইন আমাদের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে শৈশবের কথা বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমরা যারা ১৯৮০-১৯৯৫ সাল এ জন্মেছি আমরা বিশেষ কিছু ছিলাম না, তবে আমরা যথেষ্ট ভাগ্যবান ছিলাম যখন আমরা ছোট ছিলাম হাতগুলো জামার মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে বলতাম, আমার হাত নেই!!! একটা কলম ছিল যার চার রকম কালি আর আমরা তার চারটে বোতাম একসাথে টেপার চেষ্টা করতাম… দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকতাম কেউ এলে চমকে দেবো বলে, সে আসতে দেরি করছে বলে অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে আসতাম…ভাবতাম আমি যেখানে যাচ্ছি, চাঁদটাও আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে…সুইচের দুদিকে আঙুল চেপে সুইচটাকে অন-অফ এর মাঝামাঝি অবস্থায় আনার চেষ্টা করতাম…তখন আমাদের শুধু একটা জিনিসের খেয়াল রাখার দায়িত্ব ছিলো, স্কুলে যাওয়ার পর বই-খাতা,ক্লাসে বসে কলম-কলম খেলা,খাতায় ক্রিকেট, চোর-ডাকাত-বাবু-পুলিশ খেলতাম…স্কুল ছুটির পর কটকটি, বস্তা আইসক্রিম, পাইপ আইসক্রিম, হাওয়াই মিঠা না খেতে পারলে মনটাই খারাপ হয়ে যেত…নারিকেল গাছের পাতা টেনে ঝুলে থাকতাম!!!স্কুল ছুটি হলে দৌড়ে বাসায় আসতাম মিনা কার্টুন, শক্তিমান, টম এন্ড জেরী, ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট দেখার জন্য আর শুক্রবারে দুপুর ৩টা থেকে অপেক্ষা করতাম কখন বিটিভিতে বাংলা সিনেমা শুরু হবে এবং সন্ধার পরে আলিফ লায়লা, সিন্দাবাদ, রবিনহুড, টিম নাইটরাইডার, রোবোকপ, ম্যাকগাইভার দেখার জন্য পুরো সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম… ফলের দানা খেয়ে ফেললে দুশ্চিন্তা করতাম পেটের মধ্যে এবার গাছ হবে…ঘরের মধ্যে ছুটে যেতাম,তারপর কি দরকার ভুলে যেতাম, ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে পড়ত…যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন ধৈর্য্য সহ্য হতো না যে কবে বড় হবো… আর এখন মনে করি, কেন যে বড় হলাম!বিকেলে খেলতে না পারলে বিকালটাই মাটি হয়ে যেত… ফাইনাল পরীক্ষা যেহেতু শেষ সেহেতু সকালে পড়া নাই… এত মজা কই রাখি?নানু বাড়ি,দাদু বাড়ি যাওয়ার এই তো সময়…ব্যাডমিন্টন,ক্যারাম,সাপ-লুডু না খেললে কি হয়!!!ডিসেম্বর মাস আর শীতকালটা আমাদেরছেলেবেলাটা এমনি কালারফুল ছিল…শীতের ভোরে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বিভিন্ন ধরনের পিঠ আর খেজুরের রস খাওয়া, ধূয়া উঠা ভাপা পিঠা দিয়ে লাকড়ির চুলায় রান্না করা খাবার খাওয়া… রোদ পোহাতে পোহাতে মুড়ি ভাজা… তবে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ যত আগাইয়া আসত মনের মধ্যে ভয় তত বাড়ত… ওইদিন যে ফাইনালের রেজাল্ট দিবে…!আজকাল ছেলে মেয়েদের শীতকাল,গরমকাল নাই… রুটিন সেই একটাই… বাসা ,স্কুল ,কলেজ ,কোচিং, ফেসবুক, চ্যাট…আর আমরা কলেজে উঠার আগ পর্যন্ত মন খারাপ ,ফ্রাসটেশন কি জিনিস বুঝতামি না… মন খারাপ মানে হইল ম্যাচের সময় প্রাইভেট বা বাসায় স্যার নাহয় হুজুর থাকা…নব্বই থেকে ২০০০ এর পর ছেলেবেলার সে দিনগুলোতে আমরা হয়ত ক্ষেত ছিলাম ,আমাদের এত এত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান ছিলনা, হয়ত লেমও ছিলাম… কিন্তু আমাদের সারাজীবন মনে রাখার মত একটা ছেলেবেলা ছিল!আমি জানি আমাদের জেনারেশনের যারা এগুলো পড়ছো,তোমাদের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে, ছোটবেলায় সবথেকে বেশিবার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নটার উত্তর আমি পেয়েছি অবশেষে… -তুমি বড়ো হয়ে কি হতে চাও?উত্তর- “আবার ছোট হতে চাই…”যেই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে শৈশবটাই কাটিয়ে দিলাম, আজ একটাই দুঃখ, কেন শৈশব হারালাম।

লেখক : গৌতম চন্দ্র বর্মন,ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি ,নিউজ ভিশন বিডি

Top