লাইলাতুল মেরাজ বা মেরাজের রজনী”

download-12.jpg

সাখাওয়াত হোছাইন শাহীন :

লাইলাতুল মেরাজ বা মেরাজের রজনী, যা সচরাচর শবে মেরাজ হিসাবে আখ্যায়িত হয়, হচ্ছে ইসলাম ধর্মমতে যে রাতে ইসলামের নবী মুহাম্মদের (দঃ) ঐশ্বরিক উপায়ে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন এবং স্রষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন সেই রাত। মুসলমানরা এবাদত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে এই রাতটি উদযাপন করেন। ইসলামে মেরাজের বিশেষ গুরুত্ব আছে, কেননা এই মেরাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ নামায মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক অর্থাৎ (ফরজ) নির্ধারণ করা হয় এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান নির্দিষ্ট করা হয়।

ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী হযরত মুহাম্মদের (দঃ) নবুওয়াত প্রকাশের একাদশ বৎসরের (৬২০ খ্রিস্টাব্দে) রজব মাসের ২৬ তারিখের দিবাগত ইসলামের নবী মুহাম্মদ প্রথমে কাবা শরীফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন এবং সেখানে তিনি নবীদের জামায়াতে ইমামতি করেন। অত:পর তিনি বোরাক বিশেষ বাহনে আসীন হয়ে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় তিনি আল্লাহ’র সাক্ষাৎ লাভ করেন। এই সফরে ফেরেশতা জিবরাইল তার সফরসঙ্গী ছিলেন। কুরআন শরীফের সূরা বাণী ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنْ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّه هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি আস্রা বিআবদিহি লাইলাম মিনাল মাসিজদিল হারামী ইলাল মাসিজদিল আকসা

বঙ্গার্থ: “পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি তাহার এক বান্দা (মুহাম্মদ)-কে মসজিদে হারাম (কাবাঘর) হইতে মসজিদে আকসা (বাইতুল মোকাদ্দাস) পর্যন্ত পরিভ্রমণ করাইয়াছেন। ইহার মধ্যে তাহাকে অসংখ্য নিদর্শনাবলী দেখান হইয়াছে।
“শব্দগত ব্যুৎপত্তি”

যদিও ইসলাম ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ কুরআন-এ “মেরাজ” শব্দটির উল্লেখ দেখা যায় না, কিন্তু যখন অবিশ্বাসীগণ মুহাম্মদের নবুয়্যতের বা ঐশ্বিক বাণীর প্রমাণস্বরূপ স্বর্গে আরোহণকরত প্রমাণ আনতে বলে, তখন সেখানে উল্লিখিত শব্দ ছিল তারকা ফিস সামা-য়ী: স্বর্গে আরোহণ করো। যেখানে তারকা মানে আরোহণ করো, আর শব্দটি রাকিয়া থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “সে আরোহণ করেছিল”। আরবি মেরাজ শব্দটি আরাজা থেকে গৃহীত, যার অর্থ সে আরোহণ করেছিল। কিন্তু এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো রাকিয়া দ্বারা দৈহিক আরোহণ বোঝায়, অথচ আরাজা দ্বারা আত্মিক আরোহণ বোঝায়। তাই ক্বোরআন কর্তৃক মুহাম্মদের “আত্মিক আরোহণ” প্রমাণিত।

এপ্রসঙ্গে ক্বোরআনের বক্তব্য হলো:

“এমন একদিন ফেরেশতা এবং রুহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হয় যা পার্থিব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান”

“মেরাজের বর্ণনা”

মেরাজ ঘটেছিল মুহাম্মদ-এর নবুয়্যত বা ঐশ্বিক বাণী প্রাপ্তির দশম বছরে। মেরাজের ঘটনায় দুটো অংশ ছিল: ১. আল-ইসরা বা জেরুজালেমে রাত্র-ভ্রমণ, এবং ২. মেরাজ বা ঊর্ধ্বারোহণ বা স্বর্গারোহণ।

একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়: নবুয়্যতের দশম বছর, সাত মাস; ২৭ রজব তারিখে মুহাম্মদ, আবু তালিবের মেয়ে হিন্দার বাড়িতে ছিলেন। আবার অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঐ রাতে মুহাম্মদ কাবাতে ঘুমান, এবং তিনি কাবা’র ঐ অংশে ঘুমান, যেখানে কোনো ছাদ ছিল না (হাতিম)।

হিন্দার বিবরণ থেকে জানা যায়, ঐ রাতে, মুহাম্মদ, রাতের প্রার্থণা সেরে ঘুমাতে যান। খুব ভোরে মুহাম্মদ উঠে সবাইকে জাগালেন এবং নামাজ আদায় করলেন। হিন্দাও তাঁর সাথে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে মুহাম্মদ(সা:) জানালেন,

ও উম্মেহানি (হিন্দার ডাক নাম), এই ঘরে আমি তোমাদের সাথে প্রার্থণা করেছি। যেমন তোমরা দেখেছ। তারপর আমি পবিত্র স্থানে গিয়েছি এবং সেখানে প্রার্থণা সেরেছি। এবং তারপর তোমাদের সাথে ভোরের প্রার্থণা সারলাম, যেমন তোমরা দেখছো।

আনাছ (রা:) মালেক ইবনে সা’সাআ’হ (রা:) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে যেই রাত্রে আল্লাহ তাআলা পরিভ্রমণে নিয়া গিয়াছিলেন সেই রাত্রের ঘটনা বর্ণনায় ছাহাবীগণের সম্মুখে তিনি বলেছেন, যখন আমি কা’বা গৃহে উন্মুক্ত অংশ হাতীমে (উপণীত হইলাম এবং তখনও আমি ভাঙ্গা ঘুমে ভারাক্রান্ত) ঊর্ধ্বমুখী শায়িত ছিলাম, হঠাৎ এক আগন্তক ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ:) আমার নিকট আসিলেন (এবং আমাকে নিকটবতী/ জমজম কূপের সন্নিকটে নিয়া আসিলেন)। অত:পর আমার বক্ষে ঊধর্ব র্সীমা হইতে পেটের নিম্ন সীমা পর্যন্ত চিরিয়া ফেলিলেন এবং আমার হৃৎপিণ্ড বা কল্বটাকে বাহির করিলেন। অত:পর একটি স্বর্ণপাত্র উপস্থিত করা হইল, যাহা ঈমান (পরিপক্ব সত্যিকার জ্ঞানবর্ধক) বস্তুতে পরিপূর্ণ ছিল । আমার কল্বটাকে (জমজমের পানিতে) ধৌত করিয়া তাহার ভিতরে ঐ বস্তু ভরিয়া দেওয়া হইল এবং কল্বটাকে নির্ধারিত স্থানে রাখিয়া আমার বক্ষকে ঠিকঠাক করিয়া দেওয়া হইল। অতপর আমার জন্য খচ্চর হইতে একটু ছোট, গাধা হইতে একটু বড় শ্বেত বর্ণের একটি বাহন উপস্থিত করা হইল তাহার নাম “বোরাক”, যাহার প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায়। সেই বাহনের উপর আমাকে সওয়ার করা হল। ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়া জিব্রাঈল (আ:) আমাকে লইয়া নিকটবর্তী তথা প্রথম আসমানের দ্বারে পৌছিলেন এবং দরজা খুলিতে বলিলেন। ভিতর হইতে পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হইল, জিব্রাঈল স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলেন। অতপর জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে আছেন? জিব্রাঈল বলিলেন, মুহাম্মদ (স:) আছেন। বলা হইল, (তাঁহাকে নিয়া আসিবার জন্যই ত আপনাকে) তাঁহার নিকট পাঠান হইয়াছিল? জিব্রাঈল বলিলেন হাঁ। তারপর আমাদের প্রতি মোবারকবাদ জানাইয়া দরজা খোলা হইল। গেটের ভিতরে প্রবেশ করিয়া তথায় আদম (আঃ)-কে দেখিতে পাইলাম । জিব্রাঈল আমাকে তাঁহার পরিচয় করাইয়া বলিলেন, তিনি আপনার আদি পিতা আদম (আঃ), তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। আমার সলামের উত্তরদানে আমাকে “সুযোগ্য পুত্র ও সুযোগ্য নবী” আখ্যায়িত করিলেন এবং খোশ আমদেদ জানাইলেন ।

Top