লক্ষ বেকারের আত্মকথা: ‘আমি বেকার বলছি’।

IMG_20180409_103825.jpg

মার্জিয়া সিদ্দিকা লিপি,সুনামগঞ্জ :

যে কোনো দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় বেকারত্ব। বেকারত্ব একটি অভিশাপ স্বরুপ, কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারদের জন্য তা মরণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তার সাথে বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে মানসিক বিকারগ্রস্থ এসব বেকারদের মধ্যে অনেকেই অস্বাভাবিক দিনাতিপাত করছে। বেকারত্বের করালগ্রাসে স্থিমিত হয়ে পড়ছে এদের প্রাণশক্তি, মিথ্যে আশ্বাস আর শত প্রবঞ্চনার বর্বর নির্যাতনে মূমুর্ষ প্রায় এসব বেকারেরা। অথচ একটি দেশের অবকাঠামোগত সার্বিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার এসব শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা এখন প্রায় ২৬ লাখ। নারী-পুরুষ উভয়েই প্রায় ১৩ লাখ করে বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএস হিসেবে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। এদেশে পড়াশোনা না করলেই কাজ পাওয়ার সুযোগ বেশি। কোনো ধরণের শিক্ষার সুযোগ পাননি, এমন মানুষের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ বেকার। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট এন্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ (সিডার) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। যার শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কম। যারা দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর যারা অনার্স মাস্টার্স পাশ করেছেন তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আরো একটি লক্ষণীয় তথ্য হলো কম শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, কিন্তু বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার খুব দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে। তার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব, যোগ্যতানুযায়ী চাকরিদানে ব্যর্থতা, অস্বচ্ছনীতি, কোটা বৈষম্য, দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, দলীয় মনোভাব ইত্যাদি। এর মধ্যে কোটা বৈষম্য, দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, দলীয় মনোভাব প্রধানতম কারণ বলে আমি মনে করি।
বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে বেশিরভাগ পদই কোটার ভিত্তিতে পূরণ করা হয়। প্রথম শ্রেণীর চাকরির মাত্র ৪৪ শতাংশ পূরণ হয় মেধার ভিত্তিতে। বাকী ৫৫ শতাংশই পূরণ করা হয় কোটার ভিত্তিতে। একটি দেশে কোটা পদ্ধতি বরাদ্ধ দেওয়া হয় সাধারণত অনগ্রসর জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। সেক্ষেত্রে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ- এই ১৬ শতাংশ কোটা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে ১০ শতাংশ জেলা কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নিয়ে অধিকাংশ চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীর আপত্তি। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যারা মহান ব্রত নিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করার মানসে যুদ্ধ করে অনেকে প্রাণ দিয়েছেন, শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকে আবার সুস্থাবস্থায় দেশ স্বাধীন করেছেন। তাদের কেউই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুবিধা ভোগ করবেন সেই মনোবৃত্তি থেকে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন নি। তারা দেশকে স্বাধীন করার জন্য, পাকিস্থানি শোষনবাহিনীর নির্যাতনের নিষ্পেষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্তি করার জন্য যুদ্ধ করেছেন এবং দেশ স্বাধীন করেছেন। তাদের প্রতি আমরা বিনম্র শ্রদ্ধাবনত। তাদের অবদানের প্রতিদান কোনো কিছু দিয়ে শেষ করা যাবেনা। এসব মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান কিংবা নাতি/নাতনীদের চাকরিতে বিশেষ কোটা সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারটি যদিও ‘সৎ লোকের সন্তানের তার বাবার সৎ কর্মের প্রতিদান’ দাবীর মতো ঘটনা, তারপরও সে সুবিধা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা থাকতোনা যদি তা মাত্রাতিরিক্ত না হতো! স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবার অবদানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের সুবিধা অবশ্যই দেওয়া যেতে পারে, তবে তা কতটুকু? যারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল তাদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, আজীবন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিনা খরচে চিকিৎসা প্রদান ও শিক্ষাক্ষেত্র বৃত্তি প্রদান সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। তবে চাকরির ক্ষেত্রে নিশ্চয় ৩০ শতাংশ হতে পারেনা! তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধার নাতি/নাতনীরা কেন এই সুবিধা পাবে? অযোগ্য ও মেধাহীনরা কেন বিনা প্রতিযোগিতায় প্রথম শ্রেণীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাবে? নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়েরা হাজারো প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনেক কষ্টে, দিন মজুরি করে, টিউশনি করে, অনেকে আবার মানবেতর জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে অনার্স/মাস্টার্স ডিগ্রীপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের অধম্য মেধাশক্তি দ্বারা তুমুল প্রতিযোগিতা করেও চাকরি পাচ্ছে না শুধুমাত্র কোটা বৈষম্যনীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় মনোভাবের কারণে। অথচ তাদের থেকে তুলনামূলকভাবে নিতান্তই কম মেধাবী ও অযোগ্যরা কেবল মুক্তিযোদ্ধার নাতি/নাতনীর অজুহাতে অনায়াসে বিনা প্রতিযোগিতায় এসব চাকরি পেয়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও চাকরিতে প্রবেশ করতে হলে মোটা অংকের ঘুষ গুণতে হয়, যাদের আছে তারা যোগ্যতা না থাকা স্বত্তেও চাকরি পেয়ে যাচ্ছে কিন্তু যাদের নেই তাদের কেবলই হতাশায় পর্যবেষিত হতে হয় বারবার। স্বজনপ্রীতি ও দলীয় মনোভাব আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় এক্ষেত্রে। উচ্চ শ্রেণীর কর্মকতা-কর্মচারী, এমপি, মন্ত্রীদের স্বজনরা ও একই সুবিধা পাচ্ছে; এতে থাকছে আবার দলীয় মনোভাব ও। আজকাল চাকরি বাজারে দলীয় মনোভাব ও প্রাধান্য পাচ্ছে ব্যাপক হারে। ফলে চাকরিপ্রার্থী যারা সাধারণ আমজনতার কাতারে তারা এমতাবস্থায় গূঢ় চাকরি সংকটে ভুগছে, হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেচে নিচ্ছে, কেউ বা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ বা যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
সূতরাং, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যে এবং দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কল্পে শিগ্রই নতুন কর্মসংস্থান তৈরী সহ কোটা বৈষম্য সংশোধন, দলীয় মনোভাব ও স্বজনপ্রীতি পরিহার, ঘুষ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং চাকরি ক্ষেত্র স্বচ্ছতা আনয়ন অতীব জরুরী। তাই এই সমস্যা সমাধানের প্রেক্ষিতে, দেশের যুব সমাজকে আশু ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত। নয়তো বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আমাদের জন্য দুঃসাধ্য ও কল্পনার সামিল হবে।

মার্জিয়া সিদ্দিকা লিপি
অনার্স ৪র্থ বর্ষ (বাংলা)
সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ।

তথ্য সূত্র : নেট

Top