নারী বান্ধব গণ পরিবহণ এখন সময়ের দাবী।

download-1-2.jpg

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

গণ পরিবহণ নারীদের জন্য একটা বিরাট অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীরা নির্বিঘ্নে গণ পরিবহণে চলাচল করতে পারছেনা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে গণ পরিবহণে যাতায়াতকারী  ৯৪ শতাংশ নারী কোন না কোনভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গত  “৬ মার্চ,১৮ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়। রাজধানীরাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুরের নারীদের কাছ থেকে মত নিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক “ প্রতিবেদনে বলা হয় নারীরা নানান ধরণের হেনেস্তার শিকার হন। এর মধ্যে ইচ্ছাকৃত স্পর্শচিমটি কাটাকাছে ঘেঁষে দাঁড়ানোআস্তে ধাক্কা দেওয়াচুল স্পর্শ করা বা কাঁধে হাত রাখার মতো বিষয় রয়েছে বলে জানানো হয়। খুব বিস্ময়, আশ্চর্য এবং দুঃখের বিষয় হচ্ছে হেনেস্তকারীদের বেশীরভাগ পুরুষের বয়স হচ্ছে ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী। বাবার বয়সী পুরুষ বা বুড়ো মানুষগুলোর এ কেমন বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশ তা ভাবতেই গা শিহরে উঠে, নিজেদের প্রতি ঘৃণা জন্মে। ২১ থেকে ৬০ বছর কেউ কারো থেকে কম যান না। সবাই যেন উৎ পেতে থাকে নারীদের হেনেস্তা করার জন্য। আক্রান্ত নারীদের ৭৯ শতাংশ এই অপ্রীতিকর অবস্থায় চুপ থেকে নিজেদের স্থান বদলে নেন। দুঃখজনক হলেও সত্যঅনেকক্ষেত্রে নারীরা গণ পরিবহণে ধর্ষণের শিকারও হচ্ছেন। শুধু কি তাই ধর্ষণের পর অনেককেই নির্মম, পৈশাচিক এবং করুণভাবে খুনও করা হচ্ছে। চলন্তবাসে তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা আমাদের হৃদয়কে, মানবিক মূল্যবোধকে, বিবেককে ভারাক্রান্ত, ক্ষুব্ধ এবং রক্তাক্ত করে তোলে। প্রসঙ্গক্রমে বিগত ২৫ আগষট’ ১৭ রাতে চলন্ত বাসে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী তরুণী রুপা খাতুনকে ধর্ষণের পর ঘাড় মটকে খুন করার ঘটনা তখন সারা দেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলে। পরে আদালতে দোষীদের শাস্তি এবং অর্থ দন্ড প্রদান করে।

দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, আর্থ সামাজিক উন্নতি, সমাজ বিনির্মাণে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। আমাদের দেশের নারীরা এখন ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী নন। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি, বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নারী শিক্ষার্থীদের পদচারণাও কম নয়। এখন মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশায় তাঁদের অংশ গ্রহণ বেড়েছে যাতে দেশের অর্থনীতিতে, আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতিতে, তাঁদের অংশগ্রহণ এবং অবাদান অনস্বীকার্য। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীদের নানামুখী অংশগ্রহণ অবদান দেশের অর্থনীতির ভীতকে দিনের পর দিন উন্নত এবং মজবুত করছে। এক সময় নারীরা গৃহ কর্মী,  কৃষিকাজ, কুঠির শিল্প, গার্মেন্টস শিল্প এবং  শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। এবং প্রধান নির্বাহী বা উন্যান্য উঁচু পদে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক কম। কিন্ত এখন ব্যবসা বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বা অন্যান্য উঁচু পদে, আইনপেশা, ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারক, প্রকৌশলী, ডাক্তার, নার্স, সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠান, এন জি ও, ব্যাংক বীমা সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোথায় নেই নারীদের সহজ এবং অবাধ বিচরণ। তাছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহীনি, বিজিবি এবং সশস্ত্র বাহিনীসমূহতে এমনকি বিমান উড্ডয়ন সহ কঠিন কাজগুলোতেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। ঘর থেক বেরুতে গেলেই বেশীরভাগ নারীকে গণ পরিবহণে চড়তে হয় আর তাতে যদি যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর, বিপদজনক, মনোবেদনা মূলক, অপ্রি্‌য়, অসুন্দর নোংরা এবং অশ্লীল কর্মকাণ্ডের সম্মুখীন হতে হয় তবে তা তাঁদের জন্য খুবই দুঃখজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত। এসব নিন্দনীয় গর্হিত অনৈতিক কাজ তাঁদের মন মানসিকতার উপর, সামাজিক পরিবেশের উপর বিরূপ নেতিবাচক কু প্রভাব ফেলে। যা তাঁদের মনোজগতে এক ভয়াবহ অস্থিরতার জন্ম দেয়।  ভয় আতংক শঙ্কা ভয় মনে সবসময় ভর করে থাকে।

এই অসভ্য অভদ্র অসৌজন্য আদিম নোংরা অশ্লীল এবং বিকৃত যৌন বিকৃতি আমাদের ব্যক্তি, পরিবার আর সমাজ জীবনে প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত আগ্রাসী আকাশ ও অপ সংস্কৃতি দায়ী। বিজ্ঞান একদিকে আমাদের জীবনকে দিয়েছে গতি, ছন্দময় সুন্দর জীবন অপরদিকে ঘটাচ্ছে জীবনের সুন্দর গতির ছন্দপতন, মন মানসিকতার অধঃপতন। আমরা শুভ সুন্দর ভালো জিনিষটাকে গ্রহণ করে জীবনকে অপরূপ সুন্দর না করে আগ্রাসী আকাশ সংস্কৃতি, বিজাতীয় ও অপসংস্কৃতির চর্চা, প্রসার ও বিকাশে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছি। নিজস্ব স্বকীয়, স্বাতন্ত্র্য, দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা প্রকাশ বিকাশ ও প্রসারের যথাযথ ব্যবস্থা না করে নিজেদেরকে তথাকথিত অতি আধুনিক, প্রগতিশীল আর মুক্তমনা জাহির করতে ধর্মীয় রীতিনীতি বা অনুশাসন না মেনে নিজেদের অস্থিত্ব শেকড় বাঙ্গালীত্বকে বিসর্জন দিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিচ্ছি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।  নানান ধরণের অশ্লীলতা যৌনতা নীল ছবির দংশনে আক্রান্ত হয়ে, নেশাগ্রস্থতা বা মাদকাসক্তিতে আসক্তি শিশু, নারী শিশুদেরকে বিভিন্নভাবে হেনেস্তা, নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডে এসব বিপথগামীদের অনুপ্রাণিত করছে হর হামেশা। অনেকেই গণ পরিবহণে নারীদের হেনেস্তা, অপমান, যৌন হয়রানি করছে কোন রকম লাগ শরমের তোয়াক্কা না করে। পাপবোধ কাজ করছে না। কাজ করছে না মনের ভেতর অপরাধ বোধ। যেন সব বোধশক্তি ভোঁতা আর বিলুপ্ত হয়ে গেছে।   

সামাজিক, রাজনৈতিক, মানবিক, নৈতিক, ধর্মীয় দায়বদ্ধতার মাধ্যমে সমাজে সমাজ থেকে নারীদের বিরুদ্ধে গুরুতর শিশু, নারী শিশুর প্রতি নির্যাতন, খুন ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বন্ধ করার জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং দৃষ্ঠান্ত মূলক শাস্তি প্রদানে কঠোরভাবে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এই নির্লজ্জতা থেকে বেরুনোর জন্য পারিবারিক, সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষা, ধর্মীয় রীতি-নীতি বা অনুশাসন মেনে চলার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করাটাও জরুরী। গণ পরিবহণে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, নারীদের জন্য বসার জায়গা সংরক্ষিত রাখা, নারীদের জন্য বি আর টি সি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বিশেষ বা আলাদা পরিবহণের ব্যবস্থা করা জরুরী। বিগত কয়েক দশক আগে দেশে এসিড সন্ত্রাস বেড়ে গিয়েছিল তখন আইনের পরিবর্তন এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগের ফলে দেশে এখন এসিড সন্ত্রাস নেই বললেই চলে। দেশে শিশু, নারী শিশু খুন হত্যা ধর্ষণ যৌন হয়রানি এবং গণ পরিবহণে নারী হেনেস্তা বন্ধে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি আইনের পরিবর্তন বা সংশোধন করা এবং তাঁর দ্রুত, কার্যকরী প্রয়োগ এবং যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা অতীব জরুরী। অন্যথায় আমাদের মা বোন মেয়েদের ইজ্জৎ, আভ্রু, সম্ভ্রম রক্ষার ব্যর্থতার জন্য আমাদের মা জাতিরা কক্ষনোই দেশ ও জাতিকে ক্ষমা করবে না। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নারীদের ভূমিকা এবং অংশ গ্রহণ নিশ্চিতকরণের জন্য এবং নারী হেনেস্তা বন্ধে নারী বান্ধব গণ পরিবহণের ব্যবস্থা করা দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের নৈতিক  দায়িত্ব এবং সময়ের দাবী।

Top