মহান মে দিবসে ঝুঁকিমুক্ত শিশু শ্রমের প্রত্যাশা : মো: মনজুরুল আলম চৌধুরী

unnamed.png

======================
মহান মে দিবস শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত একটি দিন যেখানে তাঁদের ন্যায্য মজুরী এবং দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রম ঘণ্টা নির্ধারণের আন্দোলন ছিল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় শতকের পর শতক অতিবাহিত হলেও এখনো শ্রমিকদেরকে তাঁদের ন্যায্য মজুরীর জন্য আন্দোলন করতে হয়, আন্দোলন করতে হয় আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজের পাওনার জন্য। মহানবী (সঃ) বলেছেন – শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁদের প্রাপ্য মজুরী পরিশোধ করে দিও। পরিতাপের বিষয়, ঘাম শুকানোর কথা দূরে থাক দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয়ে যায়। আবার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয় অনেকেই। বঞ্চিতদের মধ্যে অধিকতর কষ্টকর, নির্মম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে শিশু শ্রমিকরা। “২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, ১৪ বছরের নীচে কোনো শিশুকে কাজে নেয়া যাবে না৷ ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেওয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেওয়া যাবে না”।

দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। দুঃখের বিষয়, শিশুদের যে সময়ে কলম বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, নিজেদের শিশু কৈশোরের দুরন্তপনা উপভোগ করার কথা,বিভিন্ন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, নিজেদের বিদ্যা, মেধা, মননশীল, সৃষ্টিশীল সুকুমার প্রবৃত্তি সহ বিভিন্ন প্রতিভা প্রকাশ আর বিকাশে ভূমিকা রাখার কথা, দেশের সুস্থ সবল সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠার কথা সেই সময় তাঁদের কোমল দু’টি হাতে উঠেছে কাজের বিভিন্ন হাতিয়ার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা সত্য ১৪ বছরের নীচের অনেক শিশুই আজ বিভিন্ন কাজে অংশ নিচ্ছে তবে খুব ভয়াবহ এবং আতংকের ব্যাপার হচ্ছে তাঁদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে যুক্ত আছে। যদিও উক্ত আইনে “শিশুদের জন্য ৩৮ ধরনের ঝঁকিপূর্ণ কাজে নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়”৷ এখন আমাদের চট্টগ্রামেই শিশুরা টেম্পু, বাস, মেক্সির হেল্পার, ওয়েল্ডিং কারখানার কাজ, কৃষিকাজ, মোটর গ্যারেজ, জুতা, ট্যানারী, চামড়া শিল্প, বিড়ি তৈরি কাজ, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প প্রতিষ্ঠান, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, তুলা ও আঁশ জাতীয় শিল্পের কাজ, কামার শিল্পের কাজ যার অধিকাংশই শিশুদের জন্য, তাঁদের শরীরের জন্য, তাদের মন মানসিকতা বিকাশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এসব কাজে অংশ নিয়ে অনেক শিশু হাত পা চোখ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। অনেকে হাঁপানি, শ্বাস-কষ্ট, যক্ষ্মার মতো মারাত্মক রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশু শ্রমিকরা। এদের বেশীরভাগ স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু। তাঁরা পরিবারের অস্বচ্ছলতার কারণে আজ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে।

এক সময় শিশুদের একটা বড় অংশ শুধু গৃহ কর্মী হিসেবেই কাজ করতো যা কিছুটা হাল্কা কাজের আওতায় ছিল। তাছাড়া কারখানা ছাড়া বিভিন্ন দোকান, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ও ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান, চায়ের দোকান, হোটেল রেস্টুরেন্ট, প্রেস ও বাইন্ডিং, প্যাকেজিং, কঙ্কর ভাঙ্গা, বিল্ডিং ব্রিজ বাঁধ সহ বিভিন্ন নির্মাণ কাজে, চা বাগান ইত্যাদিতে প্রচুর সংখ্যক শিশু শ্রমিক কাজ করে থাকে। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা শিশু শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে বেশী আগ্রহী হয়ে থাকেন কেননা কম মজুরিতে বেশী সময় খাটানো যায় বা বেশী কাজ আদায় করা যায়, কাজের ব্যাঘাত ঘটলে দৈহিক মানসিক নির্যাতন, বেতন কর্তন, যখন তখন কাজ থেকে বের করে দেয়ার একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারী মনোভাবও কাজ করে থাকে মালিক পক্ষের মনে। ছুটি না দিয়ে বন্ধের দিনেও এদের খাটানো যায়। তাছাড়া এরা প্রায়শ শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত দৈহিকভবাবে নিগৃহীত হয়ে থাকে। সামান্য ভুলের জন্য এদেরকে চড়, কিল, ঘুষি, থাপ্পড় দিতে কেউ এতটুকু সঙ্কোচ বা দ্বিধাবোধ করেনা।
বলতে গেলে এরা আজ নব্য দাস প্রথার শিকার। বিশেষ করে গৃহ কর্মে নিয়োজিত নারী শিশু বা কিশোরীদের জন্য এককালে গৃহে কাজ করা নিরাপদ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কিন্তু গৃহ কর্মীরা এখন সব চাইতে বেশী দৈহিক, মানসিক, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তাঁদেরকে নির্যাতনের যে লোমহর্ষক কাহিনী সমাজের বিভিন্ন উচু তলার লোকদের দ্বারা সংঘটিত হতে দেখা যায় তাতে এদেরকে মানুষ হিসেবে ভাবতেও কষ্ট লাগে। কত অপ্রাপ্ত বয়স্কা নারী শিশু ও কিশোরীরা যৌন লালাসার শিকার হয়ে অকাল মাতৃত্বের জন্য মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে তার খবর কেইবা রাখে। বড় বা ধনী লোক বা তাঁদের আদরের দুলালদের কোনদিন বিচারের মুখোমুখিও করা সম্ভব হয়নি।
আমাদের জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে কত নারী শিশু, কিশোরীদের সামান্য কারণে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে হয়। কিন্তু অর্থ বিত্তের কারণে তার বিচার তো হয়না বরং গরীব দুঃখী মানুষদের কিছু অর্থ দিয়ে চুপ বা মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। গরীব, অসহায়, নিঃস্ব, নদী ভাঙ্গনের ফলে বাস্তুভিটে হারা ভাসমান মানুষদের শিশুরা আজ লেখা পড়ার পরিবর্তে সংসারের হাল ধরার জন্য বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে তা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও। আমাদের দেশে অন্যান্য আইনের মতো শ্রম আইনেও শিশুদের সুরক্ষার জন্য, চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে বিভিন্ন শর্ত আছে যা অন্যান্য আইনের মতো কেউই মানছে না। আইন থাকলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে অনেক শিশু আজ কম মজুরিতে কাজ করছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা খুব একটা দৃশ্যমান নয় এবং তা কার্যকরের উদ্যোগ নিতেও দেখা যাচ্ছে না। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সবল সুন্দর রাখার জন্য প্রয়োজন তাঁদের অর্থনৈতিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দারিদ্রতার জন্য শিশু শ্রমকে উপেক্ষা করা সম্ভবপর নয়। অতএব দেশ জাতি আর রাষ্ট্রের উচিৎ শিশু শ্রমিকদের জন্য মানবিক, নৈতিক এবং ন্যূনতম আইনগত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখার জন্য সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয় তবে এর জন্য বেশী উদ্যোগী হতে হবে ব্যবসায়ীক সম্প্রদায়কে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, সমাজসেবী সংঘটন, এনজিও সহ সমাজের সবাইকে একসাথে কাজ করলে ইতিবাচক কিছু হতে পারে। শিশুশ্রম বন্ধে আইনের সুষ্ঠু এবং যথাযথ প্রয়োগ দরকার। জাতির প্রত্যাশা কোমলমতি শিশুদের জায়গা হবে স্কুলে তাদের হাতে থাকবে বই খাতা কলম হাতুড়ী নয়।

Top