বর্ষার ভারী বর্ষণ থেকে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে সতর্কতা-ইউএনএইচসিআর-এর শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট

images-1-1.jpg
আশরাফুল করিম নোমান,কক্সবাজার  :
বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রক্ষা করতে সময়ের সাথে পাল্লা দিতে হচ্ছে বলে সতর্ক করেন  ইউএনএইচসিআর-এর শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট ৤ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় বাংলাদেশীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানান ব্লানচেট  ৤
ইউএনএইচসিআর-এর শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট আজকে সতর্ক করেছেন যে, বাংলাদেশে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রক্ষা করতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে । আগামী মাসগুলোতে ভারী বৃষ্টি, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় এবং খারাপ আবহাওয়া ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে থাকা এক লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মারাত্নক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে । এ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর করে ফেরা ব্লানচেট “জরুরী অবস্থার ভিতরে আরও একটি জরুরী অবস্থা” যাতে এড়িয়ে যাওয়া যায় এর জন্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং এর সহযোগী সংগঠন যারা বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করছে তাদের প্রতি সাহায্যের জন্য জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ।
২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত ৬,৭১,০০০-এর অধিক রোহিঙ্গা নিরাপত্তা চেয়ে  বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে । “রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ইতোমধ্যেই চিহ্নিত সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভয়াবহ যাত্রার অভিজ্ঞতা করেছে ।  তারা অকল্পনীয় মাত্রায় ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ও  সাহস দেখিয়েছে”, এ সপ্তাহে কক্সবাজারের কাছে কুতুপালং, নয়াপাড়া ও চাকমারকুল স্থাপনায় পরিদর্শন শেষে ব্লানচেট এ কথা বলেন । তিনি আরও বলেন, যেহেতু এখন বর্ষাকাল দ্রুত ঘনিয়ে আসছে, ইউএনএইচসিআর এবং এর সহযোগী সংগঠনসহ বাংলাদেশ সরকার সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে কিভাবে শরণার্থীদের আসন্ন বন্যা ও ভূমিধ্বস মোকাবেলায় যতটা সম্ভব সক্ষম করে তোলা যায়” ।
ব্লানচেট  বলেন “আমি সরাসরি দেখেছি কিভাবে ইউএনএইচসিআর তার সহযোগী সংগঠন ও শরণার্থীদেরকে সাথে নিয়ে কক্সবাজারে জরুরী অবস্থার ভিতরে আরও একটি জরুরী অবস্থা এড়াতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে । কর্মীরা মাঠে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোতে  আবাসন ও প্রাক-বর্ষার সরঞ্জামাদি বিতরণ করছেন । রাস্তাঘাট, সেতু, সিঁড়ি এবং অন্যান্য স্থাপনা যেগুলো বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে সেগুলো শক্তপোক্ত করছেন এবং নিরাপদ স্থানে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নিচ্ছেন । কিন্তু তারপরেও জরুরী ভিত্তিতে আরও সাহায্য দরকার যাতে শরণার্থীরা নিরাপদে থাকতে পারেন”।
এই সংকটে বাংলাদেশ সরকার এবং এদেশের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও দায়িত্ব সহভাগিতার জন্য আহ্বান জানিয়ে ব্লানচেট বলেন, “প্রথমত বাংলাদেশের জনগণ এবং সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারাই এই জরুরী পরিস্থিতিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, যেখানে ইউএনএইচসিআর-এর মতো সংস্থা এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোও সহযোগিতা করেছে ।  কিন্তু আমি সঠিক করে বলতে পারছি না এই রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কতটা সাহায্যের দরকার হতে পারে যাদের সিংহভাগই হচ্ছে নারী ও শিশু । এটিই হচ্ছে সাড়া বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া শরণার্থী সংকট । বর্ষা মৌসুম আসছে, এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বেসরকারী খাত এবং ব্যাক্তি পর্যায়ের সবারই উচিত যতটুকু সম্ভব এই রাষ্ট্রহীন শরণার্থী এবং এদের পাশাপাশি যেসব স্থানীয় জনগণ তাদের স্থান দিচ্ছেন তাদেরকে সহযোগিতা করা ।
রোহিঙ্গারা হচ্ছে রাষ্ট্রহীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী । রোহিঙ্গাদের এই আগমনের পুরো সময় জুড়ে বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণ অভাবনীয় আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। জরুরী অবস্থার ভিতরে আরও একটি জরুরী অবস্থার তীব্র ঝুঁকিতে থেকে ইউএনএইচসিআর এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো কক্সবাজারে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণকে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে প্রস্তুত করতে বাংলাদেশের সরকারকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে ।
ইউএনএইচসিআর কক্সবাজারের এমারজেন্সি অপারেশনের প্রধান কেভিন জে. এল্যান বলেন, “বাংলাদেশ হাজার হাজার জীবন বাঁচিয়েছিল নিজের সীমানা এবং নিজের দু’হাত খুলে দিয়ে । এটা এখন আমাদের জন্য জরুরী যে ঘূর্ণিঝড় এবং ভারী বৃষ্টির সময় জোরালোভাবে বাংলাদেশ এবং শরণার্থীদের পাশে থেকে সহায়তা করা” ।
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য একটা সম্মানজনক ও সাবলীল জীবনের ব্যবস্থা করতে  ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান এবং আত্ননিরভরতার সুযোগ যাতে তারা পায় ।  এই শরণার্থী সংকটের সমাধান নিহিত আছে মায়ানমারে, এবং ইউএনএইচসিআর মায়ানমারকে আহ্বান জানাচ্ছে যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসয় প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি রাখাইন প্রদেশে তৈরি করে এবং যাতে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় নিজের ঘরে ফিরে যেতে পারে ।
ইউএনএইচসিআর রাখাইন প্রদেশে সকল সম্প্রদায় এবং যে সব এলাকা থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসেছিল এবং সম্ভাব্য যেখানে ফিরে যাবে সেসব এলাকায় অবাধে মানবিক সহায়তা প্রদানের অনুমতি চাচ্ছে । ইউএনএইচসিআর রাখাইন এডভাইসরি কমিশনের সুপারিশমালা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য মায়ানমার সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাবও দিয়েছে ।
শরণার্থী এবং এই জরুরী অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগণকে সহায়তা করার জন্য গত সপ্তাহে ইন্টার এজেন্সি নতুন করে ৯৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক প্রয়োজনীয়তা উপস্থাপন করেছে, যা দিয়ে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত   সহযোগিতা দেয়া যাবে । ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন বাঁচানোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এবং স্থানীয় জনগণকেও সহযোগিতা করতে ১৯৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করেছে ।
Top